ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও আইরিস যাচাইকরণের দাবিতে জনস্বার্থ মামলায় কেন্দ্র ও নির্বাচন কমিশনকে নোটিস
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির আরও বিস্তৃত ব্যবহারের প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ মোড় নিল দেশের বিচারব্যবস্থা। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের পরিচয় নিশ্চিত করতে আঙুলের ছাপ এবং চোখের মণির স্ক্যান ভিত্তিক বায়োমেট্রিক যাচাইকরণ চালুর দাবিতে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলায় কেন্দ্র সরকার এবং ভারতীয় নির্বাচন কমিশনকে নোটিস জারি করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। যদিও আদালত এখনও এই ব্যবস্থা চালুর কোনো নির্দেশ দেয়নি, তবুও মামলাটিকে গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির মতামত চাওয়ায় বিষয়টি নতুন করে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।
আবেদনকারীর দাবি, বর্তমানে ভোটার পরিচয়পত্র, ভোটার তালিকা ও অন্যান্য প্রচলিত পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাঝে-মধ্যেই ভুয়ো ভোট, প্রক্সি ভোট, একই ব্যক্তির একাধিকবার ভোটদানের চেষ্টা কিংবা অন্যের পরিচয়ে ভোট দেওয়ার মতো অভিযোগ সামনে আসে। আধুনিক বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে ভোটারের পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং নির্বাচনী অনিয়ম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
তবে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সংবিধান, নির্বাচন আইন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, তথ্য সুরক্ষা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও বিপুল আর্থিক ব্যয়ের প্রশ্ন। তাই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আদালত কেন্দ্র সরকার ও নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে বিস্তারিত মতামত, বাস্তবায়নের সম্ভাবনা, আইনি কাঠামো, আর্থিক প্রভাব এবং সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়েছে। বায়োমেট্রিক ব্যবস্থার সমর্থকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে।
ভারতে আধারভিত্তিক বায়োমেট্রিক পরিচয় ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা থাকায় ভোটার যাচাইকরণেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলে নির্বাচনী স্বচ্ছতা আরও বৃদ্ধি পাবে। এতে প্রক্সি ভোট, ভুয়ো পরিচয়ে ভোটদান এবং একাধিকবার ভোট দেওয়ার মতো অনিয়ম কার্যকরভাবে রোধ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ভোটের ফলাফল নিয়ে অযথা বিতর্কও অনেকাংশে কমে আসতে পারে বলে তাঁদের মত।
তবে বিরোধী মতও কম জোরালো নয়। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার কর্মী এবং নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলির একাংশের মতে, ভোটারের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, সম্ভাব্য তথ্য ফাঁস, সাইবার হামলা, ডেটার অপব্যবহার এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে প্রকৃত ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকা, দুর্গম অঞ্চল, প্রবীণ নাগরিক, শ্রমজীবী মানুষের ক্ষয়প্রাপ্ত আঙুলের ছাপ কিংবা প্রযুক্তিগত বিভ্রাটের মতো বাস্তব সমস্যাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
আদালতও পর্যবেক্ষণ করেছে যে, নির্বাচনী ব্যবস্থায় বায়োমেট্রিক যাচাইকরণ চালু করতে হলে শুধু প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুললেই হবে না; এর জন্য নির্বাচন আইন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট বিধিবিধানেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে হতে পারে। ফলে বিষয়টি তড়িঘড়ি বাস্তবায়নের পরিবর্তে সুপরিকল্পিত ও সর্বাঙ্গীণ মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, যদি ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে দেশের প্রায় প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে বায়োমেট্রিক যন্ত্র, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ, প্রশিক্ষিত নির্বাচনকর্মী, নিরাপদ তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ভোটারের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষায় কঠোর আইনি কাঠামো নিশ্চিত করাও অপরিহার্য হবে।
এই মামলাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর, আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল নির্বাচন ব্যবস্থার দাবি জোরদার হচ্ছে, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং তথ্য সুরক্ষার প্রশ্নও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতের ভারতের নির্বাচন কি প্রযুক্তির আরও উন্নত স্তরে পৌঁছাবে, নাকি প্রচলিত ব্যবস্থাকেই আরও শক্তিশালী করা হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন অনেকটাই নির্ভর করছে সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী শুনানি এবং কেন্দ্র সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থানের উপর।
ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এই মামলার চূড়ান্ত রায় কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের পথই নির্ধারণ করবে না, বরং ভবিষ্যতের নির্বাচন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা, গোপনীয়তা এবং নাগরিক অধিকারের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা হবে, সেই দিকনির্দেশও স্থির করতে পারে। তাই এই মামলার অগ্রগতি এখন রাজনৈতিক মহল, আইন বিশেষজ্ঞ, নির্বাচন বিশ্লেষক এবং সাধারণ ভোটার সবার কাছেই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।





