প্রশ্ন করলেই জুটছে দেশবিরোধী, সিআইএ, সোরোস ও নকশাল তকমা!
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া দাম, বেকারত্বের করাল গ্রাস, আর একের পর এক নারীনির্যাতনের ঘটনা, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট যখন চরমে, ঠিক তখনই রাজনীতিজুড়ে চলছে এক অদ্ভুত বিভ্রান্তির খেলা। বিরোধী বা সচেতন নাগরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুললেই অমনি জুটে যাচ্ছে নানা তকমা ‘জর্জ সোরোসের দালাল’, ‘ডিপ স্টেট’, ‘সিআইএ’, ‘দিমাগী নকশাল’, ‘পাপ্পু’, ‘চটি চাটা’, এমনকি ‘বাংলাদেশি’ বা ‘পাকিস্তানি’। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শাসকদলের এই তকমা সেঁটে দেওয়ার রাজনীতি আসলে নিজেদের মৌলিক ব্যর্থতাগুলো ঢাকবার এক চাতুর্যপূর্ণ কৌশল।
বর্তমানে দেশে জনস্বার্থের প্রশ্ন তুললেই যদি তকমা জোটে, তবে প্রশাসনিক নীতি ও সিদ্ধান্তের তথাকথিত ‘মাস্টারস্ট্রোক’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ মহল। তাদের মূল বক্তব্য, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ যখন চরমে, তখন একের পর এক বিতর্কিত পদক্ষেপকে যেভাবে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে চালানো হচ্ছে, তা আদতে দেশের সার্বিক অগ্রগতির জন্য বড় হুমকি।
পররাষ্ট্র ও বিদেশনীতির ক্ষেত্রে সরকারের একাধিক পদক্ষেপকে বুদ্ধিজীবীরা দ্বিমুখী নীতি হিসেবে দেখছেন, মার্কিন রাষ্ট্রপতিকে প্রকাশ্যে ‘মাই ফ্রেন্ড’ (আমার বন্ধু) বলে প্রচার চালানো হলেও, ভারত কিন্তু বারবার তাদের ট্যারিফ বা শুল্কের ধাক্কা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। আরও মারাত্মক বিষয়, দেশের ভেতরে ঢুকে নাশকতার ছক কষা বা নজরদারির অভিযোগে আটক মার্কিন এজেন্টের প্রতি নমনীয় মনোভাব দেখানো সত্ত্বেও সেটিকে সংবাদমাধ্যমে ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবে প্রমোট করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা বিতর্কিত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তড়িঘড়ি ভারতে দীর্ঘমেয়াদে আশ্রয় দেওয়াকে ‘কূটনৈতিক মাস্টারস্ট্রোক’ বলা হলেও, তা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের ওপর কী ধরনের চাপ তৈরি করছে, তা এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। একটি উন্নয়নশীল দেশে ৮০ কোটি মানুষকে এখনও ‘ফ্রি রেশন’ এর ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, দশকজুড়ে ক্ষমতায় থাকার পর এটি কি সরকারের অর্থনৈতিক সাফল্যের পরিচয়, নাকি ব্যাপক দারিদ্র্য ও অসাম্যের দলিল?
রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোকে একে একে বন্ধ করে বা প্রাইভেটাইজ করে দেশের সমস্ত বড় ব্যবসা ও সম্পদ মূলত দু-একজন বিশিষ্ট শিল্পপতির হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা নতুন বড় পরিকাঠামো না বানিয়ে শুধু হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে একের পর এক প্রাচীন শহরের নাম পরিবর্তন করাকেই বড় প্রাপ্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ওঠানামা করলেও দেশে পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমানো হচ্ছে না। নতুন কোনো উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান নেই, নিত্যপণ্যের দাম কমানোর কোনো স্থায়ী উদ্যোগও লক্ষণীয় নয়।
উন্নয়নের দোহাই দিয়ে প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর যে সীমাহীন অত্যাচার চালানো হচ্ছে, তা আগামী প্রজন্মের জন্য চরম বিপদ ডেকে আনছে। যে বিশাল রেন ফরেস্ট দেশের অক্সিজেনের যোগান দেয়, তা কেটে বসানো হচ্ছে বড় বড় ডাটা সেন্টার। পরিবেশবিদরা হুশিয়ারি দিচ্ছেন, এই প্রকৃতির ওপর অত্যাচারের খেসারত দেশের প্রতিটি মানুষকে এক দিন দিতেই হবে। ছাত্র বা যুব আন্দোলন দমন করতে যেখানে মুহূর্তের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ হাজার আধাসেনা ও পুলিশ নামিয়ে দেওয়া হয়, ঠিক সেই রাজধানীর বুকে ও রাজ্যগুলোতে প্রতিদিন ঘটে চলা গণধর্ষণ ও নারীনির্যাতনের ঘটনা রুখতে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা স্পষ্ট ধরা পড়ে।
আজ কেবল সরকারের মন্ত্রী বা ক্ষমতাসীন দলের নেতারা নন, নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কমিশন বা অন্যান্য নিরপেক্ষ সংস্থাকে প্রশ্ন করলেও নাকি মিলছে সেই একই চেনা উত্তর, ‘সোরোস-সিআইএ-নকশাল’ তকমা! সরকার ও স্বাধীন সংবিধানিক সংস্থাগুলোর এই ধরনের আচরণে চরম ক্ষুব্ধ দেশের সচেতন সমাজ। অভিযোগ উঠছে, মূল সামাজিক সমস্যার কোনো সমাধান না করে এবং সত্যিকারের নিরপেক্ষ উন্নয়ন না ঘটিয়ে কেবল “হিন্দুরা বিপদে আছে” বা “হিন্দুরাষ্ট্র গঠন না হলে উন্নয়ন সম্ভব নয়” এই ধরনের তত্ত্ব ছড়িয়ে মূল আলোচনাকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
আজকের মিলেনিয়াল এবং সচেতন নাগরিক সমাজ স্পষ্ট জানাচ্ছে, এই গোঁজামিলের রাজনীতি ও প্রকৃতি ধ্বংসের খেলা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখতে যারা আজ গোটা প্রশাসনিক ও সামাজিক সিস্টেমকে ব্যবহার করছে এবং যারা এই অন্যায় ব্যবস্থাকে চুপচাপ সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছে, এক দিন ইতিহাসের বিচারে তাদেরও একইভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। আগামী প্রজন্ম কখনো এই ভুল ও শোষণকে ক্ষমা করবে না।





