বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ আসামের শ্রীভুমি জেলার সীমান্ত ঘেঁষা এলাকা পাথারকান্দির ছাগলময়ায় আবারও এক বর্বর ও চাঞ্চল্যকর মারপিটের ঘটনা ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পরিস্থিতি। চলন্ত গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে এক অটোচালক ও তার সঙ্গে থাকা এক মহিলা যাত্রীকে গাছে বেঁধে বেধড়ক পেটানোর মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে।
এই হামলায় ওই চালক ও মহিলা উভয়ই গুরুতরভাবে আহত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহত অটোচালকের বাড়ি আছিমগঞ্জ হাটখলায় বলে জানা গেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র বাজারিছড়া ও পাথারকান্দি অঞ্চলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একটি অতি সাধারণ গবাদি পশু পরিবহন সংক্রান্ত সন্দেহের জেরেই কি এই নৃশংসে হামলা, নাকি এর নেপথ্যে কাজ করছে পুরানো কোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক শত্রুতার সমীকরণ?
প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, করিমগঞ্জের আছিমগঞ্জ হাটখলার বাসিন্দা ওই অটোচালক ঘটনার দিন পাথারকান্দি এলাকা থেকে এক মহিলাকে রিজার্ভ যাত্রী হিসেবে নিয়ে বাজারিছড়ার ছাগলময়ায় গিয়েছিলেন। অভিযোগ, গন্তব্যে পৌঁছানোর পরেই সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের গাড়িটিকে ঘিরে ফেলে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয় গালিগালাজ এবং টানাটানি।পরবর্তীকালে আহতদের বয়ান অনুযায়ী যা জানা গেছে, তা অত্যন্ত শিউরে ওঠার মতো। আক্রান্ত অটোচালক ও মহিলা যাত্রীর সরাসরি অভিযোগ, তাদেরকে গাড়ি থেকে বলপূর্বক টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে একটি গাছে দড়ি দিয়ে বেঁধে নির্বিচারে মারধর করা হয়।
শুধু তাই নয়, আহতদের পক্ষ থেকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছে গত আগস্ট মাসের বহুল আলোচিত বিকাশ ধর হত্যাকাণ্ডের পরিবারের সদস্যসহ স্থানীয় জয়ন্ত, জুগল, বিট্টু এবং আরও কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। তাঁদের দাবি, কোনো প্রকার কথা না শুনে বা সুযোগ না দিয়ে একটি চক্র আইন নিজেদের হাতে তুলে নিয়ে তাঁদের ওপর এই অতর্কিত হামলা চালিয়েছে।
এই ঘটনার মূল উৎস ও সত্যতা অনুসন্ধানে গণমাধ্যম ‘প্রতিদিন পরিবেশন’-এর পক্ষ থেকে সরাসরি বাজারিছড়া থানার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিকের (ওসি) সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পুলিশ সূত্রের বয়ান অনুযায়ী ঘটনার চিত্রটি একটু ভিন্ন। ওসি জানান, ওই ব্যক্তিদের আইনি নিয়ম মেনেই এলাকা থেকে গরু নিয়ে আসার অনুমতি (পারমিশন) ছিল। তবে সরকারি বা স্থানীয় নিয়ম অনুযায়ী, স্থানীয় পঞ্চায়েত মেম্বার বা প্রতিনিধিকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের সেখানে যাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু ঘটনাস্থলে মেম্বারকে না পেয়ে তাঁরা নিজেরাই একা সেখানে গরু আনতে যান। এদিকে ছাগলময়া এলাকায় হুট করে কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে গরু টানাটানি করতে দেখে স্থানীয় অধিবাসীদের মনে প্রবল সন্দেহ তৈরি হয়। সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন ঘটনা ও স্থানীয় উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে এই সন্দেহই নিমেষে সহিংস রূপ নেয় এবং অটোচালক ও যাত্রীদের ওপর চড়াও হয় ক্ষুব্ধ জনতা।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বক্তব্য থেকে ‘গবাদি পশু চুরি বা পাচারের সন্দেহ’ প্রকাশ পেলেও প্রশ্ন উঠছে—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার সাধারণ মানুষকে কে দিল? একজন অটোচালক, যিনি কেবল ভাড়ার বিনিময়ে যাত্রী পৌঁছে দিতে গিয়েছেন এবং একজন মহিলাকে এভাবে গাছে বেঁধে পিটিয়ে ‘গণআদালত’ বসানো কোন সভ্য সমাজের লক্ষণ? যদিও আহতদের এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার আসল কারণ এবং হামলাকারীদের সঠিক পরিচয় পেতে ইতিমধ্যেই পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু হয়েছে।
আঞ্চলিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, সীমান্ত অঞ্চলে সন্দেহজনক গরু কেনাবেচা বা পাচার সংক্রান্ত উত্তেজনার সুযোগ নিয়ে অনেকেই ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে সক্রিয় হয়ে উঠছে। আইনশৃঙ্খলার এই শিথিলতা ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন হাতে তুলে নেওয়ার এই বিপজ্জনক প্রবণতা যদি পুলিশ কড়া হাতে দমন না করে, তবে আগামী দিনে এ ধরনের ঘটনা বড়সড় কোনো সামাজিক বিশৃঙ্খলার রূপ নিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, বাজারিছড়া থানা পুলিশ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করাতে কতটুকু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।





