‘পড়বে ভারত, এগোবে ভারত’ কেবল বিজ্ঞাপনেই, সরকারি শিক্ষার করুণ দশায় পিষে যাচ্ছে গরিবের সন্তান

রাজ্যসভায় শিক্ষক শূন্যপদ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জয়ন্ত চৌধুরী যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এক উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে। ইউডাইস প্লাস ২০২৫-২৬ এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সরকারি, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত এবং বেসরকারি— সব ধরনের মিলিয়ে ১ লক্ষ ৮৪৩টি স্কুলে মাত্র একজন শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।

এই পরিসংখ্যান নিছক একটি সংখ্যা নয়, এটি দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতার এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। কারণ একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে একাধিক শ্রেণির পাঠদান, প্রশাসনিক কাজ, সরকারি জরিপ, ভোটের দায়িত্ব, মিড-ডে মিল তদারকি, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের নথিপত্র তৈরি সবকিছু সামলাতে হয়। ফলে শিক্ষাদানের মূল উদ্দেশ্যই অনেক ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হয়।

কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের দাবি, জাতীয় স্তরে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত এখনও নির্ধারিত মানের মধ্যেই রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে প্রতি ১৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক, উচ্চ প্রাথমিক স্তরে প্রতি ১৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক, মাধ্যমিক স্তরে প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে প্রতি ২৩ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। শিক্ষা মন্ত্রকের মতে, এই অনুপাত জাতীয় শিক্ষা নীতিতে নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

কাগজে-কলমে এই অনুপাত সন্তোষজনক মনে হলেও বাস্তবে ছবিটা একেবারেই ভিন্ন। কারণ জাতীয় গড় অনেক সময় স্থানীয় বৈষম্যকে আড়াল করে দেয়। একটি শহুরে বিদ্যালয়ে যেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন, সেখানে বহু গ্রামীণ, পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলে একজন শিক্ষকই পাঁচ-ছয়টি শ্রেণির দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষাবিদদের মতে, এই ধরনের গড় পরিসংখ্যান দেখিয়ে প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করা যায়, কিন্তু সমাধান করা যায় না।

কোন রাজ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষক সংকট? রাজ্যভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক-শিক্ষকবিশিষ্ট স্কুলের সংখ্যায় দেশের শীর্ষে রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশ। রাজ্যটিতে এমন স্কুলের সংখ্যা ১৬,৩৫৭টি, যা দেশের মোট এক-শিক্ষকবিশিষ্ট স্কুলের ১৬ শতাংশেরও বেশি। এরপরই রয়েছে ঝাড়খণ্ড, যেখানে এমন স্কুলের সংখ্যা ৯,৮২৭টি। তৃতীয় স্থানে মহারাষ্ট্র  সেখানে ৯,২৬৯টি স্কুল মাত্র একজন শিক্ষককে নিয়ে চলছে।

এছাড়া কর্ণাটকে রয়েছে ৮,০৪২টি, উত্তরপ্রদেশে ৭,৮৭৪টি, রাজস্থানে ৭,২০০টি এবং পশ্চিমবঙ্গে ৬,৭৬৯টি এক-শিক্ষকবিশিষ্ট স্কুল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সাতটি রাজ্যেই দেশের মোট এক-শিক্ষকবিশিষ্ট স্কুলের প্রায় ৬৫ শতাংশ কেন্দ্রীভূত। ফলে স্পষ্ট, দেশের শিক্ষক সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে এই রাজ্যগুলিই।

দেশের এক-শিক্ষকবিশিষ্ট মোট স্কুলের প্রায় ৬৫ শতাংশই এই সাতটি রাজ্যে অবস্থিত, যা শিক্ষক সংকটের ভৌগোলিক বৈষম্যকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এছাড়াও তেলেঙ্গানায় ৪,৭৯৩টি, তামিলনাড়ুতে ৩,৯৫৭টি, অসমে ৩,১৫৯টি, হিমাচল প্রদেশে ৩,১২৮টি, উত্তরাখণ্ডে ২,৬৫৫টি এবং ছত্তীসগড়ে ২,৪৬১টি এক-শিক্ষকবিশিষ্ট স্কুল রয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, সমস্যা শুধু কয়েকটি রাজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেই শিক্ষক সংকট গভীরভাবে বিস্তৃত।

অন্যদিকে, কিছু রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কেরলে এমন স্কুলের সংখ্যা মাত্র ৬৭টি, নাগাল্যান্ডে ৩৫টি, সিকিমে ৩১টি, লাদাখে ২৮টি, দিল্লিতে ৭টি এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মাত্র একটি এক-শিক্ষকবিশিষ্ট স্কুল রয়েছে। এই পরিসংখ্যান দেখায়, সুষ্ঠু শিক্ষক নিয়োগ ও কার্যকর মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এক-শিক্ষক নির্ভর বিদ্যালয়ের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।

শিক্ষাক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন শিক্ষককে যদি একই সঙ্গে প্রথম থেকে পঞ্চম বা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হয়, তাহলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি সমান মনোযোগ দেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে। শুধু পড়ানোই নয়, বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নথিপত্র, উপস্থিতি রেজিস্টার, সরকারি রিপোর্ট, বিভিন্ন প্রকল্পের তথ্য আপলোড, মিড-ডে মিলের তদারকি, নির্বাচন ও জনগণনার মতো অতিরিক্ত সরকারি দায়িত্বও তাদের পালন করতে হয়। ফলে পাঠদানের সময় ও মান দুটোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের মৌলিক ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার ওপর। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে ওঠে।

সরকার বলছে, শিক্ষক নিয়োগ, বদলি ও পদায়নের দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। শিক্ষক শূন্যপদের পেছনে অবসর, পদত্যাগ, নতুন পদ সৃষ্টি, ছাত্রসংখ্যার পরিবর্তন এবং শিক্ষকদের পুনর্বণ্টনের মতো কারণ রয়েছে। এছাড়া রাজ্যগুলিকে স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং ‘সমগ্র শিক্ষা’ প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, যদি আর্থিক সহায়তা ও নীতিগত নির্দেশনা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে এখনও কেন দেশের এক লক্ষেরও বেশি স্কুলে মাত্র একজন শিক্ষক? দেশে আজ স্মার্ট ক্লাসরুম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন লার্নিং ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বহু স্কুলে প্রযুক্তি তো দূরের কথা, পর্যাপ্ত শিক্ষকই নেই।

একজন শিক্ষক যখন একাধিক শ্রেণির পাঠদান করেন, তখন ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা চিহ্নিত করা, শেখার অগ্রগতি মূল্যায়ন করা কিংবা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার ব্যবধান আরও বাড়তে থাকে, যা ভবিষ্যতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকেও তীব্র করতে পারে।

শিক্ষাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে। সেই ভবিষ্যৎ যদি একজন মাত্র শিক্ষকের কাঁধে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। জাতীয় গড়ের ইতিবাচক পরিসংখ্যান যতই আশাব্যঞ্জক শোনাক না কেন, এক লক্ষেরও বেশি এক-শিক্ষকবিশিষ্ট স্কুলের বাস্তবতা প্রমাণ করে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও বড় ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য ও ঘাটতি রয়ে গেছে।

“পড়বে ভারত, এগোবে ভারত” এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু স্লোগান নয়, প্রতিটি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করার দিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের ভারত গড়বে। আর তাদের ভবিষ্যৎ যেন কোনওভাবেই একজন শিক্ষকের সীমাহীন দায়িত্বের ভারে আটকে না পড়ে সেই দায়িত্ব সরকার ও সমাজ উভয়েরই।

Related Posts

১২ বছরে ১৭ কোটিরও বেশি কর্মসংস্থান!

বেকারত্ব নেমেছে ৩.১ শতাংশে,  জেন জি-র ক্ষোভের মাঝেই কর্মসংস্থানের রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ মোদী সরকারের বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ দেশে বেকারত্ব, চাকরির সংকট এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিয়ে যখন রাজনৈতিক বিতর্ক…

রামমন্দির নির্মাণে ব্যয় তিনগুণ! ৮০০ কোটি থেকে ২,২০০ কোটি প্রাক্তন হিসাবরক্ষকের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ

প্রণামী চুরি ধরা পড়েছিল ২০২১ সালেই, তথ্য ও প্রমাণ জমা মহিপাল সিংয়ে, খতিয়ে দেখছে বিশেষ তদন্তকারী দল বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ অযোধ্যার রামমন্দিরকে ঘিরে বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলেও এবার…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *