এনএসও-র সমীক্ষায় বড় শহরের হতাশাজনক চিত্র, ১০ লক্ষাধিক জনসংখ্যার শহরেই বেকারত্ব ৪.৯%
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ উন্নত পরিকাঠামো, আধুনিক শিল্প, বহুজাতিক সংস্থার উপস্থিতি, উচ্চ বেতনের চাকরির সম্ভাবনা এবং উন্নত জীবনযাত্রার আশায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ দেশের বড় শহরগুলির দিকে ছুটে আসছেন। কিন্তু বাস্তবের ছবিটা কি সত্যিই এতটা আশাব্যঞ্জক? কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তর (এনএসও)-এর ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক রিপোর্ট যেন সেই ধারণাকেই বড়সড় ধাক্কা দিল।
সরকারি তথ্য বলছে, দেশের ১০ লক্ষাধিক জনসংখ্যার ৪৬টি বৃহৎ শহরে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৪.৯ শতাংশ, যা অন্যান্য শহরাঞ্চলের (৪.৭ শতাংশ) তুলনায় বেশি। অর্থাৎ যেখানে কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বেশি সুযোগ থাকার কথা, সেই শহরগুলিতেই কাজের সন্ধানে ঘুরছেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। এই পরিসংখ্যান শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং দেশের নগর অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান নীতির সামনে এক কঠিন প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় শহর মানেই কর্মসংস্থানের অফুরন্ত সুযোগ—এই ধারণা এখন আর পুরোপুরি সত্য নয়। গত কয়েক বছরে জনসংখ্যার চাপ, দ্রুত নগরায়ন, দক্ষতা ও চাকরির চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের প্রসার এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের সংকোচনের ফলে বহু শিক্ষিত যুবক-যুবতী প্রত্যাশিত কাজ পাচ্ছেন না। ফলে বড় শহরগুলিতে বেকারত্বের হার বাড়ছে, যা উদ্বেগের বিষয়। তবে এই ছবির আরেকটি দিকও রয়েছে।
এনএসও-র রিপোর্টে দেখা গেছে, বড় শহরগুলিতে কর্মরতদের মধ্যে ৫৮.৫ শতাংশ নিয়মিত বেতন বা মজুরিভিত্তিক চাকরিতে নিযুক্ত। অন্যদিকে, ছোট ও মাঝারি শহরে এই হার মাত্র ৪২.৯ শতাংশ। অর্থাৎ একবার চাকরি মিললে বড় শহরে তুলনামূলকভাবে স্থায়ী ও নিয়মিত আয়ের সম্ভাবনা বেশি। একইভাবে অস্থায়ী বা দিনমজুরিভিত্তিক শ্রমিকের হার বড় শহরে মাত্র ৬.৩ শতাংশ, যেখানে অন্যান্য শহরে তা ১৪.৪ শতাংশ। এই তথ্য স্পষ্ট করে যে বড় শহরে চাকরি পাওয়া কঠিন হলেও, চাকরি পেলে তার স্থায়িত্ব ও আয়ের নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে বেশি।
তবে প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুল বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, স্টার্টআপ, পরিষেবা খাত এবং সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও কেন দেশের বড় শহরগুলি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না? অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন কর্মসংস্থানের তুলনায় চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা অনেক দ্রুত বাড়ছে। ফলে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে এবং বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন থেকে যাচ্ছেন।
এনএসও-র রিপোর্টে দেশের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের একটি ইতিবাচক চিত্রও উঠে এসেছে। বৃহৎ শহরগুলির মধ্যে ব্যবসায়িক উদ্যোগের নিরিখে শীর্ষে রয়েছে কলকাতা, সুরাত এবং গ্রেটার হায়দরাবাদ। দেশের ১০ লক্ষাধিক জনসংখ্যার শহরগুলির মোট ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ২২ শতাংশেরও বেশি এই তিনটি শহরেই কেন্দ্রীভূত। অর্থাৎ শিল্প, বাণিজ্য ও পরিষেবা খাতে এই শহরগুলির অবদান এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অসংগঠিত অর্থনীতিতে মহিলা উদ্যোক্তাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ। রিপোর্ট অনুযায়ী, ৪৬টি বড় শহরের মধ্যে ৩২টিতে ২০ শতাংশেরও বেশি প্রতিষ্ঠান মহিলাদের মালিকানাধীন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের দৃষ্টান্ত নয়, বরং নগর অর্থনীতির একটি ইতিবাচক পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত। ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিষেবা, হস্তশিল্প, খাদ্য শিল্প, অনলাইন বাণিজ্য ও গৃহভিত্তিক উদ্যোগে মহিলাদের অংশগ্রহণ ক্রমশ বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের অর্থনীতিকে নতুন দিশা দেখাতে পারে।
তবে সামগ্রিক ছবিতে উদ্বেগের কারণ কম নয়। বড় শহরগুলিতে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনের খরচ, যাতায়াতের ব্যয় এবং প্রতিযোগিতা। এর সঙ্গে যদি দীর্ঘদিন কর্মসংস্থানের অভাব যুক্ত হয়, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষিত যুবসমাজের মধ্যে হতাশা, দক্ষতার অপচয় এবং আংশিক কর্মসংস্থানের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শিল্প স্থাপন বা অবকাঠামো নির্মাণ করলেই কর্মসংস্থানের সমস্যা মিটবে না। প্রয়োজন দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় শিল্পকে উৎসাহ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে কর্মীদের দক্ষতার সামঞ্জস্য গড়ে তোলা। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করাও জরুরি।
এনএসও-র এই রিপোর্ট নগর ভারতের সামনে এক দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একদিকে বড় শহরগুলিতে তুলনামূলকভাবে উন্নত ও নিয়মিত চাকরির সুযোগ রয়েছে, অন্যদিকে সেই চাকরি পাওয়ার লড়াইও সবচেয়ে কঠিন। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দেশের মহানগর ও বড় শহরগুলি কি সত্যিই কর্মসংস্থানের ইঞ্জিন হয়ে উঠতে পেরেছে, নাকি ক্রমশ বেকার শিক্ষিত যুবকদের হতাশার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে?
আগামী দিনে এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে সরকারের কর্মসংস্থান নীতি, শিল্পায়নের গতি, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং নতুন প্রজন্মের জন্য কতটা বাস্তবভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা যায়, তার ওপর। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল অট্টালিকা, মেট্রো রেল বা স্মার্ট সিটি নয়, মানুষের হাতে সম্মানজনক কাজ তুলে দেওয়াই একটি সুস্থ অর্থনীতির সবচেয়ে বড় পরিচয়।





