হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনায় ব্যাপক দুর্নীতি! তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ দেশের রাজধানী দিল্লির সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঘিরে সামনে এসেছে এক বিস্ফোরক দুর্নীতির অভিযোগ। হাসপাতালের রোগীদের জন্য চাদর থেকে শুরু করে ওআরএস, এক্স-রে মেশিন, উন্নত রেডিওলজিক্যাল যন্ত্র, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাজারদরের বহু গুণ বেশি দামে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার অভিযোগ উঠেছে। ভিজিল্যান্স তদন্তে প্রাথমিকভাবে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা শুধু প্রশাসনিক মহলেই নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
১৫ টাকার ওআরএস ২০৫ টাকায়, ১০ লক্ষের এক্স-রে মেশিন ৩৩ লক্ষে কেনার অভিযোগ
ইতিমধ্যেই দিল্লি পুলিশের দুর্নীতি দমন শাখা (অ্যান্টি করাপশন ব্রাঞ্চ)দিল্লি সরকারের স্বাস্থ্য দপ্তরের ডিরেক্টর জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (ডিজিএইচএস)-সহ দুই শীর্ষ আধিকারিককে গ্রেপ্তার করেছে। তদন্তকারীদের দাবি, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম এবং আর্থিক নয়ছয়ের একাধিক প্রাথমিক প্রমাণ তাঁদের হাতে এসেছে। যদিও তদন্ত এখনও চলছে এবং আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া বাকি।
তদন্তে উঠে আসা সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যগুলির মধ্যে অন্যতম হল হাসপাতালের চাদর কেনা। দিল্লি সরকারের অধীনস্থ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে মোট ইনডোর বেডের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। অথচ সেই হাসপাতালগুলির জন্য কেনা হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৬ লক্ষটি চাদর। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, মাত্র ১৫ হাজার বেডের জন্য এত বিপুল সংখ্যক চাদরের প্রয়োজন হল কেন? শুধু তাই নয়, বাজারে যেখানে একটি সাধারণ হাসপাতালের চাদরের দাম প্রায় ১৫০ টাকা, সেখানে অভিযোগ অনুযায়ী প্রতিটি চাদর কেনা হয়েছে প্রায় ৪৫০ টাকারও বেশি দামে। অর্থাৎ একই পণ্যের ক্ষেত্রে প্রায় তিনগুণ মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
১৫০ টাকা দামের চাদর কেনা হয়েছে ৪০০ টাকায়, ১৫ হাজার বেডের জন্য ১৬.৫ লক্ষ টাকা
তদন্তে আরও উঠে এসেছে ওআরএস কেনার ক্ষেত্রে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সাধারণ বাজারে একটি ওআরএস প্যাকেটের দাম প্রায় ১৫ টাকা। অথচ সরকারি টেন্ডারের মাধ্যমে প্রতিটি প্যাকেট কেনা হয়েছে ২০৫ টাকা দরে বলে অভিযোগ। সূত্রের দাবি, মোট প্রায় ৫০ লক্ষ ওআরএস প্যাকেট কেনা হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, গরমের সময় শহরজুড়ে কুলিং জোন তৈরি করে ব্যাপকভাবে ওআরএস বিতরণের প্রচারের আড়ালে এই বিপুল কেনাকাটার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল।
শুধু দৈনন্দিন চিকিৎসা সামগ্রী নয়, চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রেও ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ উঠেছে। তদন্তে দাবি করা হয়েছে, সাধারণত বাজারে একটি পোর্টেবল এক্স-রে মেশিনের মূল্য প্রায় ১০ লক্ষ টাকা। অথচ দিল্লি সরকারের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট এজেন্সি (সিপিএ) প্রতিটি মেশিন কিনেছে প্রায় ৩৩ লক্ষ টাকা দরে।
মোট ৪৪৮টি এক্স-রে মেশিন কেনা হয়েছে। সেই হিসাবে যেখানে মোট ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৪৫ কোটি টাকা, সেখানে সরকারি নথিতে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ১৪৮ কোটি টাকা। একইভাবে প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা বাজারমূল্যের উন্নত রেডিওলজিক্যাল যন্ত্র কেনা হয়েছে ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকা দরে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এই বিপুল মূল্যবৃদ্ধি কীভাবে অনুমোদন পেল, তা নিয়েই তদন্তকারীরা বিস্তারিত অনুসন্ধান শুরু করেছেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে বিরোধীরা। তাদের অভিযোগ, গত বছর দিল্লিতে সরকার পরিবর্তনের পর সরকারি হাসপাতালগুলির নিজস্বভাবে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষমতা বাতিল করে দেওয়া হয়।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সমস্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনার একমাত্র অধিকার দেওয়া হয় সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট এজেন্সিকে। একই সঙ্গে নতুন ডিরেক্টর জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস নিয়োগ করা হয়। বিরোধীদের দাবি, এরপর থেকেই কেন্দ্রীভূত ক্রয় ব্যবস্থার আড়ালে শুরু হয় ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম। ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তীব্র বাকযুদ্ধ।
আম আদমি পার্টির নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ অভিযোগ করেছেন, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ১৬ মাসের মধ্যেই প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ২৭ বছর পর দিল্লিতে ক্ষমতায় ফিরে বিজেপি সুদে-আসলে সব উসুল করতে নেমেছে। সরকারি হাসপাতালের কেনাকাটার সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে একটি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। তারপরই শুরু হয় দুর্নীতির উৎসব।
তিনি আরও দাবি করেন, দিল্লিবাসীকে ওআরএস বিতরণের নামে যে প্রচার চালানো হচ্ছিল, তার আড়ালেই বিপুল দামে ওআরএস কেনার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল। অন্যদিকে বিজেপির দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের বক্তব্য, এই অনিয়ম ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে। ভিজিল্যান্স তদন্ত শুরু হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট শীর্ষ আধিকারিকদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। বিজেপির দাবি, তারা দুর্নীতিকে আড়াল না করে আইনের পথে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যেও।
দিল্লিতে দুই কোটিরও বেশি মানুষের একটি বড় অংশ সরকারি হাসপাতালের উপর নির্ভরশীল। যদিও এইমস, সফদরজং হাসপাতাল এবং রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতাল কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে পরিচালিত হয়, তবুও দিল্লি সরকার ও পুরসভার অধীনে থাকা ৪২টি সরকারি হাসপাতাল প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ রোগীকে পরিষেবা দিয়ে থাকে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে যদি সত্যিই বাজারদরের বহু গুণ বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থে আরও উন্নত পরিকাঠামো, ওষুধ, চিকিৎসক নিয়োগ এবং রোগী পরিষেবার উন্নতি সম্ভব ছিল। বর্তমানে গোটা বিষয়টি তদন্তাধীন।
ভিজিল্যান্স এবং দুর্নীতি দমন শাখা নথিপত্র, টেন্ডার প্রক্রিয়া, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে। তদন্তের ফলাফল এবং আদালতের সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করবে অভিযোগগুলির সত্যতা। এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজা যতই তীব্র হোক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট, জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল খাতে সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
চিকিৎসা পরিষেবার সঙ্গে কোটি কোটি সাধারণ মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সরাসরি জড়িত। ফলে এই খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কঠোর আর্থিক নজরদারির কোনও বিকল্প নেই। এখন গোটা দেশের নজর তদন্তকারী সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আদালতের বিচারের দিকে। এখন সেদিকেই নজর গোটা দেশের।





