হাফিজ মছদ্দর আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারি অর্থের হরিলুট, আমলাতন্ত্রের খাঁচায় বন্দি প্রাথমিক শিক্ষা
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ সরকারি খাতায় শিক্ষার মানোন্নয়ন, ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’, আর ‘সর্বশিক্ষা অভিযান’ এর মতো বাহারি বিজ্ঞাপনের ঝলকানি চারপাশে। নিখরচায় বই, রঙিন ইউনিফর্ম, থালায় থালায় স্কিমভিত্তিক মিড-ডে মিলের পুষ্টিকর খাবার, আর মাসে মাসে বৃত্তি সবই মিলছে শত শত কোটি টাকা খরচে। কিন্তু সব আয়োজন, সব বন্দোবস্ত যাঁর জন্য, সেই ‘শিক্ষার্থী’ই নেই!
কাটিগড়া শিক্ষা খণ্ডের অন্তর্গত গোবিন্দপুর ক্লাস্টারের হাফিজ মছদ্দর আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্প্রতি এমন এক আজব কাণ্ড প্রত্যক্ষ করে চোখ কপালে উঠেছে শিক্ষা অনুরাগী মহলের। পুরো বিদ্যালয়ে অনিয়মিতভাবে হলেও বর্তমানে বই-খাতা হাতে ছাঁয়া ফেলে মাত্র একজন শিক্ষার্থী (তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র)। আর তাকে ‘তৈরি’ করতে, বা সহজ কথায় সরকারি খাতা-কলমে উপস্থিতির কোরাম পূরণ করতে প্রতিদিন হাজিরা দিচ্ছেন দুই দুই জন পূর্ণ শিক্ষক!

একদিকে জেলার একাধিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক-সংকটে এক একজন শিক্ষককে তিন-চারটি শ্রেণির ক্লাস একাধারে সামলাতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে, বহু শিশু তাদের মৌলিক শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে; ঠিক তখনই এই হাফিজ মছদ্দর আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলছে জনসম্পদ ও রাজকোষের অবাধ শ্রাদ্ধ।
স্থানীয় সূত্রের খবর, এই বিদ্যালয়টির অতীত এমন বিচ্ছিরি ছিল না। একসময় আশপাশের গ্রামের বহু কচিকাঁচাদের কিচিরমিচিরে মুখরিত থাকত বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। কিন্তু গত কয়েক বছরে বিদ্যালয়ের পঠন-পাঠনের মান, পরিকাঠামো এবং পরিচালনা ব্যবস্থার ওপর থেকে ভরসা হারান অভিভাবকেরা। একে একে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের সন্তানদের অন্য সরকারি কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন।
শিক্ষা ব্যবস্থার বেহাল দশায় কারণে, কমতে কমতে ছাত্রসংখ্যা এসে ঠেকেছে নিখাদ ‘এক’-এ। একালে এক ছাত্রকে নিয়েই প্রতিদিন বিদ্যালয় খুলছে, ঘণ্টা বাজছে, জাতীয় সংগীত গাওয়া হচ্ছে, আর দুই শিক্ষক তাঁদের দৈনিক ডিউটি ও প্রশাসনিক খাতাপত্র সই করে মাস শেষে মোটা অঙ্কের সরকারি বেতন পকেটে পুরছেন। রূপকথার গল্পের মতো শোনালেও, এটিই কাটিগড়ার শিক্ষা খণ্ডের তেতো ও নগ্ন বাস্তব।
এলাকাবাসীর একাংশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যেখানে এক একজন শিক্ষককে চারটে ক্লাসের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে কালঘাম ছুটছে, সেখানে এক ছাত্রের জন্য দুটো মাস্টারমশাই বসিয়ে রাখার যুক্তি কী? কেন অবিলম্বে শিক্ষক পুনর্বিন্যাস (টিচার র্যাশনালাইজেশন) বা বিদ্যালয় একীভূতকরণ (অ্যামালগামেশন) করা হচ্ছে না? এ ব্যাপারে যখন কাটিগড়া শিক্ষা ব্লকের ব্লক প্রাথমিক শিক্ষা আধিকারিক (বিইইও) রাজেশ চক্রবর্তীর মুখোমুখি হওয়া গেল, তিনি থোড় বড়ি খাড়া জবাব শোনালেন।
সমস্ত দায় প্রযুক্তির কাঁধে ঠেলে দিয়ে তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে ‘শিক্ষা সেতু’ অ্যাপ চালু হওয়ার পর স্থানীয় স্তরে আমাদের হাত একদম বাঁধা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আমরা চাইলেই কোনো শিক্ষক রদবদল বা স্কুল এমালগেশন করতে পারি না। গোবিন্দপুরের এই বিদ্যালয়টিকে অন্য স্কুলের সঙ্গে যুক্ত করার জন্য আমরা একাধিকবার রাজ্য দপ্তরে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। কিন্তু রাজ্য স্তরের অনুমোদন না এলে আমরা কিছুই কার্যকর করতে পারছি না।”
বিইইও-র এই মন্তব্য স্থানীয় প্রশাসনিক অসহায়তাকে স্পষ্ট করলেও, সচেতন শিক্ষা মহলে উঠছে নতুন প্রশ্ন—অ্যাপ বা ডিজিটাল নজরদারি কি তবে আমলাতান্ত্রিক লালফিতের ফাঁসে পরিণত হয়েছে? রাজ্যের শীর্ষ আধিকারিকরা কি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে শুধুই কাগজের ফাইল আর অ্যাপের ডেটা নিয়ে খেলা করছেন? মাঠপর্যায়ের এই করুণ বাস্তব কেন তাঁদের চোখে পড়ছে না?
কাটিগড়ার এই একটি ঘটনা কেবল একটি স্বতন্ত্র রূপক নয়, এটি সমগ্র রাজ্য সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার অন্ধি-সন্ধির এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। একদিকে দুই শিক্ষকের মাসিক বেতন, পরিকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ এবং একটিমাত্র শিশুর জন্য মিড-ডে মিলের রসদ জোগানোর নামে সরকারি ফান্ডের অনর্থক অপচয়। কোনো স্কুলে শিক্ষক নেই বলে ক্লাস বন্ধ, আবার কোনো স্কুলে ছাত্র নেই অথচ শিক্ষক অতিরিক্ত। সময়োপযোগী সমীক্ষা এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তের অভাবে অভিভাবকরা দিন দিন সরকারি বিদ্যালয় বিমুখ হচ্ছেন।
স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, কাটিগড়ার এই ‘এক ছাত্র-দুই শিক্ষক’ এর সার্কাস বন্ধ করতে হলে রাজ্য শিক্ষা দপ্তরকে অবিলম্বে ঘুমের ঘোর থেকে জাগতে হবে। ডিজিটাইজেশনের দোহাই দিয়ে এবং রাজপ্রাসাদোপম দপ্তরের অনুমোদনের অপেক্ষায় বসে থেকে করদাতার বিপুল টাকা জলে ভাসানো কোনো যুক্তিযুক্ত প্রশাসনিক আচরণ হতে পারে না।
জরুরি ভিত্তিতে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বিদ্যালয়টিকে দ্রুত নিকটবর্তী অন্য কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে একীভূত (অ্যামালগামেটেড) করা হোক এবং এখানকার দুই শিক্ষককে শিক্ষক-সংকটে ভোগা অন্য কোনো বিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত করা হোক এখন এটাই কাটিগড়াবাসীর জোরালো দাবি। সময়মতো এই ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না নিলে, আগামী দিনে আসামের আরও বহু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় যে শুধুই কাগজ-কলমে ‘খোলা’ থাকবে আর ভেতরে শূন্যতা বিরাজ করবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।





