পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা যাচাই করে একাধিক অসঙ্গতির সন্ধান। অভিযোগ খতিয়ে দেখছে নির্বাচন কমিশন।
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২০ অক্টোবরঃ উত্তরপ্রদেশে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেও ভোটার তালিকায় একাধিক গরমিল থাকার অভিযোগ উঠেছে। আজমগড়ে একই বাড়ির ঠিকানায় ‘বিকাশ যাদব’ নামে ১৪টি এন্ট্রি, গোরক্ষপুরে একই পরিচয়ে ছয়জন ‘অনুরাগ’ এবং লখনউয়ে একই নামে ছয়জন ভোটারের সন্ধান পাওয়ার দাবি সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠছে, ভোটার তালিকার সংশোধনে কোটি কোটি টাকা খরচ এবং ভুয়ো ও দ্বৈত ভোটার শনাক্ত করার জন্য বিশেষ সফটওয়্যার ব্যবহারের পরেও কীভাবে এই ধরনের অসঙ্গতি থেকে গেল?
গত ১৫ অক্টোবর সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব ‘সমাজবাদী ইসিআই অডিট-১’ নামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তাঁর দাবি, একটি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় একই ব্যক্তির নাম ১০ বার পর্যন্ত নথিভুক্ত রয়েছে। নিজের দাবির সমর্থনে আজমগড়, লখনউ এবং গোরক্ষপুরের একাধিক উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। বিষয়টি সামনে আসার পর নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়, অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে উত্তরপ্রদেশের পাঁচটি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা নির্বাচন কমিশনের সরকারি ওয়েবসাইটে মিলিয়ে দেখা হয়। এই যাচাইয়ের জন্য তিনটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। প্রথমত, সমাজবাদী পার্টির তালিকায় থাকা প্রতিটি নাম এবং সংশ্লিষ্ট ভোটারের ইপিআইসি নম্বর একে একে ceouttarpradesh.nic.in ওয়েবসাইটে যাচাই করা হয়।
দ্বিতীয়ত, এসআইআর-এর পর নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় ফিল্টার ব্যবহার করে এমন নাম খোঁজা হয়, যেখানে ভোটারের নাম, বাবার নাম, বয়স এবং বাড়ির নম্বর একই রয়েছে। তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত সম্পূরক ভোটার তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, সংশ্লিষ্ট নামগুলির কোনও সংশোধন বা বাদ দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে কি না। এই যাচাই প্রক্রিয়ায় একাধিক চাঞ্চল্যকর অসঙ্গতির সন্ধান পাওয়ার দাবি করা হয়েছে।
আজমগড়ে ‘বিকাশ যাদব’ নামে ১৪টি এন্ট্রি!
আজমগড় সদর বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকা নিয়ে প্রথম প্রশ্ন তোলে সমাজবাদী পার্টি। দলের দাবি ছিল, ‘বিকাশ যাদব’ নামে এক ব্যক্তির নাম ১০টি পৃথক জায়গায় নথিভুক্ত রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে যাচাই করতে গিয়ে আরও বেশি সংখ্যক এন্ট্রি পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এন্ট্রিগুলিতে বাবার নামের জায়গায় ‘জীবোধ যাদব’ এবং বাড়ির নম্বর ১৭ লেখা ছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে ‘বিকাশ যাদব’ নামে মোট ১৪টি এন্ট্রি পাওয়া যায়।
বুথ নম্বর ৪২৩: এই বুথের ভোটার তালিকায় ৭৮৩, ৭৮৪, ৭৮৬, ৭৮৭, ৭৯০ এবং ৮২০ নম্বর ক্রমিকের ছয়টি এন্ট্রিতে ‘বিকাশ যাদব’ নাম রয়েছে। প্রত্যেকের বয়স ১৯ বছর এবং বাড়ির নম্বর ১৭। এন্ট্রিগুলির মধ্যে তিনটিতে পুরুষ এবং তিনটিতে মহিলা হিসেবে লিঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। বুথ নম্বর ২২২: এই বুথে ৪০৫, ৪০৮, ৪১০ এবং ৪১৩ নম্বর ক্রমিকে ‘বিকাশ যাদব’ নামে আরও চারটি এন্ট্রি পাওয়া যায়। এর মধ্যে দু’টিতে পুরুষ এবং দু’টিতে মহিলা হিসেবে লিঙ্গ উল্লেখ রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে সম্পূরক ভোটার তালিকায় বুথ নম্বর ২২২ এবং ৪২৩ থেকে ‘বিকাশ যাদব’ নামের একটি করে এন্ট্রি বাদ দিয়েছে। তবে বাকি ১২টি এন্ট্রি এখনও তালিকায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, যাচাইয়ে একই ইপিআইসি নম্বরের অধীনে দু’জন পৃথক ব্যক্তির নাম নথিভুক্ত থাকার বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গোরক্ষপুরে ‘অনুরাগ’ নামে ছয়জন ভোটার!
গোরক্ষপুরের ক্যাম্পিয়ারগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকাতেও একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। সেখানে ‘অনুরাগ, পিতা সঞ্জয়’ নামে ছয়জন ভোটারের সন্ধান পাওয়া যায়। ছয়জনেরই ঠিকানা, বয়স এবং বাবার নাম একই বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বুথ নম্বর ৩৪৭-এর ভোটার তালিকায় ৭২৯, ৭৫৬, ৭৫৭, ৭৬০, ৭৬১ এবং ৭৬৩ নম্বর ক্রমিকে এই নামগুলি নথিভুক্ত রয়েছে।
একই বুথে আরও একটি গরমিলের সন্ধান পাওয়া যায়। বাড়ির নম্বর ২৩-এ বসবাসকারী ‘সত্যা ভামা’, স্বামী বিনোদ সিং, বয়স ২৭ বছর এই পরিচয়ে একই মহিলার নাম ৭৫৫, ৭৫৮ এবং ৭৫৯ নম্বর ক্রমিকে মোট তিনবার নথিভুক্ত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
লখনউয়ে একই নামে ছয়জন ‘অরবিন্দ কুমার’
রাজধানী লখনউয়ের পূর্বী বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকাতেও একই ধরনের অসঙ্গতির অভিযোগ সামনে এসেছে। বুথ নম্বর ১৪৯-এর ১২/১০২ বাড়ির ঠিকানায় ‘অরবিন্দ কুমার’ নামে ছয়জন ভোটারের নাম পাওয়া যায়। তাঁদের প্রত্যেকের বয়স ২৫ বছর এবং বাবার নাম ‘রাম কুমার’ বলে উল্লেখ রয়েছে। এই বুথের ভোটার তালিকায় ৭৩৯, ৭৪০, ৭৪১, ৭৪২, ৭৪৪ এবং ৭৪৫ নম্বর ক্রমিকের ছয়টি এন্ট্রিতে ‘অরবিন্দ কুমার’ নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
সাহারানপুর ও শ্রাবস্তীতেও একই অভিযোগ
শুধু আজমগড়, গোরক্ষপুর কিংবা লখনউ নয়, উত্তরপ্রদেশের আরও কয়েকটি বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকাতেও অনুরূপ গরমিলের অভিযোগ উঠেছে। সাহারানপুরের নকুড় বিধানসভা কেন্দ্রে ‘সামা পারভিন’ নামে একই ভোটারের নাম তিনটি পৃথক জায়গায় নথিভুক্ত থাকার দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, শ্রাবস্তী বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় ‘রিজওয়ান, পিতা মহররম আলি’ নামে এক ব্যক্তির নাম পাঁচবার নথিভুক্ত ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোটি কোটি টাকা খরচ, বিশেষ সফটওয়্যার, তার পরেও প্রশ্ন
এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন নির্বাচন কমিশনের তরফে দাবি করা হয়েছিল, এমন একটি বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে, যা ভোটার তালিকায় থাকা দ্বৈত নাম শনাক্ত করতে সক্ষম। কিন্তু সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেও যদি একই নাম, একই ঠিকানা, একই বয়স এবং একই বাবার নামের একাধিক এন্ট্রি থেকে যায়, তাহলে ওই সফটওয়্যারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এই প্রক্রিয়ায় উত্তরপ্রদেশে ১০ জন বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও-র মৃত্যুর কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল অর্থ ব্যয় এবং কর্মীদের উপর প্রচুর চাপের পরেও যদি ভোটার তালিকার ত্রুটি দূর না হয়, তাহলে গোটা সংশোধন প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। সমাজবাদী পার্টির দাবি, তারা এখনও পর্যন্ত প্রায় তিন লক্ষ দ্বৈত ভোটারের নাম শনাক্ত করেছে। যদিও এই সংখ্যার সত্যতা এবং অভিযোগগুলির প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত যাচাই এখনও বাকি।
অভিযোগ খতিয়ে দেখছে নির্বাচন কমিশন
উত্তরপ্রদেশের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নবদীপ রিণওয়া জানিয়েছেন, সমাজবাদী পার্টির উত্থাপিত অভিযোগগুলি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য, দলের তরফে ১০০টি বিধানসভা কেন্দ্রের তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পরই অভিযোগগুলির মধ্যে কতগুলি সত্য, তা স্পষ্ট হবে। তিনি স্বীকার করেছেন, এত বড় পরিসরে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করতে গিয়ে কিছু ত্রুটি থেকে যেতে পারে। তবে সমাজবাদী পার্টির তরফে যে সংখ্যক গরমিলের কথা বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন তার সঙ্গে একমত নয়।
দ্বৈত ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ইতিমধ্যেই সমস্ত জেলার জেলাশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এই কাজে কোনও স্তরে গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
এখন বড় প্রশ্ন, এসআইআর-এর পরেও ভোটার তালিকায় থাকা এই গরমিলগুলি কত দ্রুত সংশোধন করা হবে এবং একই পরিচয়ে একাধিক এন্ট্রি থাকার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে। তবে একই নামের একাধিক এন্ট্রি থাকলেই যে সেগুলি একই ব্যক্তির নাম, তা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয় না। নির্বাচন কমিশনের তদন্ত ও নথি যাচাইয়ের পরেই প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হবে।





