ই২০ পেট্রোল: লাভ কার, ক্ষতি কার?

২০ পেট্রোল নিয়ে দেশের বিতর্ক নতুন নয়, কিন্তু সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদনের পর সেই বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। দাবি করা হয়েছে, মাত্র তিন বছরে এপ্রিল ২০২৩ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল ব্যবহারের কারণে দেশের গাড়িচালকদের অতিরিক্ত ৮৮,২৩৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অঙ্কটি নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই দাবি কি বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন, নাকি বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের একটি অংশমাত্র?

প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, ইথানলের শক্তিঘনত্ব পেট্রোলের তুলনায় কম। এটি বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথ্য। ফলে একই পরিমাণ শক্তি উৎপাদনের জন্য তুলনামূলক বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হতে পারে। নীতি আয়োগের ২০২১ সালের ইথানল ব্লেন্ডিং রোডম্যাপেও উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ই২০ উপযোগী নয় এমন পুরনো গাড়িতে জ্বালানি দক্ষতা ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। অর্থাৎ মাইলেজ কমার সম্ভাবনাকে সরকার নিজেও একসময় সম্পূর্ণ অস্বীকার করেনি।

কিন্তু এখানেই বিতর্কের দ্বিতীয় দিকটি সামনে আসে। বাস্তবে একটি গাড়ির জ্বালানি খরচ নির্ধারণ করে কেবল জ্বালানির রাসায়নিক গঠন নয়। যানজট, রাস্তার মান, চালকের অভ্যাস, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ, টায়ারের চাপ, ইঞ্জিনের অবস্থা এসবও সমানভাবে প্রভাব ফেলে। তাই কেবল ই২০ কে অতিরিক্ত ব্যয়ের একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য, সেই প্রশ্নও অমূলক নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ৮৮,২৩৪ কোটি টাকার হিসাবটি কোনো সরকারি নিরীক্ষা বা স্বীকৃত পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি অনুসন্ধানমূলক সংবাদমাধ্যমের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি অনুমান। অনুমানভিত্তিক বিশ্লেষণ জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, সেটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থার মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন। কারণ নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তথ্যের নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে সরকারের অবস্থানও একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার উপর চাপ, এসব বাস্তবতার মধ্যেই ইথানল মিশ্রণের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এই নীতির মাধ্যমে আমদানি নির্ভরতা কমানো, কৃষকদের জন্য নতুন বাজার সৃষ্টি, আখ ও শস্যভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এগুলি কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায়। যদি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে কোনো নীতির ফলে সাধারণ ভোক্তার অতিরিক্ত ব্যয় হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যয়ের হিসাব কি স্বচ্ছভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত নয়? জনগণ কি জানার অধিকার রাখে না যে, তারা ব্যক্তিগতভাবে কতটা ব্যয় বহন করছেন এবং তার বিনিময়ে দেশ কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা অর্জন করছে? গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এই স্বচ্ছতা শুধু কাম্য নয়, অপরিহার্য।

সরকারের উচিত বাস্তবভিত্তিক, স্বাধীন এবং দীর্ঘমেয়াদি সমীক্ষা প্রকাশ করা, যেখানে বিভিন্ন ধরনের গাড়িতে ই২০ ব্যবহারের ফলে প্রকৃত মাইলেজ কতটা পরিবর্তিত হচ্ছে, তার বৈজ্ঞানিক তথ্য থাকবে। একইসঙ্গে গাড়ি নির্মাতা সংস্থা, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ভোক্তা সংগঠনগুলিকেও এই আলোচনায় যুক্ত করা প্রয়োজন। কারণ নীতির সাফল্য কেবল ঘোষণায় নয়, জনগণের আস্থা অর্জনের মধ্যেই নিহিত।

সবশেষে বলা যায়, ই২০ পেট্রোল নিয়ে বর্তমান বিতর্ককে সরকার বনাম সংবাদমাধ্যমের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত তথ্য, স্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থের প্রশ্ন। একদিকে যদি ভোক্তার সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি গুরুত্ব পায়, অন্যদিকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারণের প্রকৃত পরীক্ষা। জনগণের কাছে সত্য গোপন করে নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করে, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মাধ্যমে এবং যুক্তিনির্ভর জনআলোচনার পথেই ই২০ পেট্রোল নিয়ে চলমান বিতর্কের গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব।

Related Posts

উজান অসমের জলপ্রলয়: প্রকৃতির তাণ্ডব নাকি নাগাল্যান্ডের পরিবেশ ধ্বংসের চরম খেসারত?

সম্প্রতি উজান অসমের চরাইদেউ, শিবসাগর ও যোরহাট জেলায় যে অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ জলপ্রলয় ঘটে গেল, তা কেবল স্বাভাবিক বর্ষার পরিণতি এ কথা মেনে নিতে অস্বীকার করছেন পরিবেশবিদ থেকে শুরু করে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *