বরাকের ভুবন পাহাড়ে এবার রোপওয়ে! রাজ্য জুড়ে ৫টি রোপওয়ে প্রকল্পে হিমন্ত সরকারের সবুজ সংকেত
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৪ নভেম্বরঃ রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সামাজিক সংস্কারকে নতুন গতি দিতে মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্বশর্মার পৌরোহিত্যে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল অসম কেবিনেটের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। বৈঠক শেষে আয়োজিত এক জমজমাট সাংবাদিক সম্মেলনে কেবিনেটে গৃহীত একাধিক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
আগামী দিনে রাজ্যে দুই লক্ষ সরকারি চাকরির পথ সুগম করা, বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণের কড়া অনুশাসন কার্যকর করা, ১৯ জুলাইয়ের বিপর্যয়কারী বন্যার রহস্যভেদে সিবিআই তদন্ত, পর্যটনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে বরাকের ভুবন পাহাড়সহ ৫টি স্থানে আধুনিক রোপওয়ে নির্মাণ এবং নেলিতে ডিফেন্স পার্ক স্থাপনের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও দূরদর্শী প্রস্তাবগুলোতে সিলমোহর দিয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভা।
সামাজিক সংস্কার ও আইনি স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বহুবিবাহ নিয়ে কেবিনেটের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কঠোর ও নজিরবিহীন। মুখ্যমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দেন, অসমে বহুবিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। যদি রাজ্য সরকারের কোনো আধিকারিক বা কর্মচারী বহুবিবাহের মতো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার প্রমাণ পান, তবে তাঁকে আর কোনো সাময়িক বরখাস্ত এর সুযোগ দেওয়া হবে না, সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে।
শুধু তাই নয়, শাস্তির মাত্রা সেখানেই শেষ নয়। বরখাস্ত হওয়া সংশ্লিষ্ট আধিকারিক বা কর্মচারী জীবনে আর দ্বিতীয়বার কোনো সরকারি চাকরির পদে আবেদন করার সুযোগ বা সরকারি সুবিধা পাবেন না। মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন যে, এই অনুশাসন কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য নয়, বরং অসম সরকারের অধীনস্থ সব ধর্মের কর্মচারীদের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে।
২ লক্ষ চাকরির লক্ষ্যপূরণে বড় পদক্ষেপ, বহুবিবাহ করলে সরকারি চাকরি খারিজে সিলমোহর
রাজ্যের বেকার যুবকদের দেওয়া ২ লক্ষ সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি পূরণে কেবিনেট এক বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা দ্রুত অর্জন করতে হলে সরকারি দপ্তরে বহুদিনের জমে থাকা শূন্যপদগুলো উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। আর সে কারণেই কর্মচারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জটিল নিয়মকানুন ও বাধা দূর করে নীতি শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষের মধ্যেই সমস্ত পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে। এর ফলে ঊর্ধ্বতন পদগুলো পূরণ হওয়ার সাথে সাথে নিচের স্তরে হাজার হাজার নতুন পদ শূন্য হবে, যা নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দেবে।
এর পাশাপাশি, সেনাসদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদ থেকে অবসর গ্রহণকারী অসমের যুবক-যুবতীদের জন্য রাজ্য সরকারের যেকোনো চাকরিতে আবেদনের সর্বোচ্চ বয়সসীমা বাড়িয়ে ৪৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১৯ জুলাই শিবসাগর এবং চরাইদেউ জেলায় দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক ও ভয়াল বন্যার পেছনে কোনো কৃত্রিম বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কারণ ছিল কি না, তা নিয়ে কেবিনেটে দীর্ঘ আলোচনা হয়। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঘটনার গভীরতা ও রহস্য উদঘাটনে গোটা ঘটনার তদন্তভার কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা অর্থাৎ সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়ার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেবিনেট। তবে সিবিআই এই তদন্তভার আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করবে কি না, তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব এক্তিয়ার ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
রাজ্যের পর্যটন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতায় রাজ্য সরকার অসমের ৫টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও পর্যটন কেন্দ্রে রোপওয়ে নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যেই ভারত সরকার ও অসম সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। প্রস্তাবিত ৫টি মেগা রোপওয়ে প্রকল্প হলো, বরাকের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান গঙ্গানগর থেকে ভুবন পাহাড়ের মহাদেব মন্দির পর্যন্ত নির্মিত হবে রোপওয়ে, যা বরাকবাসীর বহুদিনের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত স্বপ্ন।
কামাখ্যা রেলওয়ে স্টেশন থেকে সরাসরি কামাখ্যা দেবীর প্রধান মন্দির পর্যন্ত। রাজধানী গুয়াহাটির যানজট এড়াতে খানাপাড়া থেকে গুয়াহাটি রেলওয়ে স্টেশন সংযোগকারী রোপওয়ে। পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগের জন্য জাতিঙ্গাকে সংযুক্ত করে তৈরি হবে বিশেষ রোপওয়ে। শোণিতপুর জেলার ঐতিহাসিক অগ্নিগড় থেকে বিখ্যাত ভৈরবী মন্দির পর্যন্ত রোপওয়ে স্থাপন। কৃষকদের ধানের ন্যায্য মূল্য সুনিশ্চিত এবং নেলিতে ডিফেন্স পার্ক।
কৃষকদের সুবিধার্থে রাজ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ধান সংগ্রহ প্রক্রিয়া শুরু করার কথা নিশ্চিত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, চলতি মরশুমে কৃষকরা প্রতি কুইন্টাল ধানের জন্য সর্বমোট ২,৬৪০ টাকা করে পাবেন। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্ধারিত মূল্য প্রতি কুইন্টালে ২,৪৪১ টাকা এবং কৃষকদের অতিরিক্ত সহায়তার জন্য রাজ্য সরকার নিজের তহবিল থেকে কুইন্টাল প্রতি অতিরিক্ত ১৯৯ টাকা প্রদান করবে।
অন্য এক ঐতিহাসিক ঘোষণায় মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্যের নেলিতে প্রায় ৬ হাজার বিঘা জমিতে এক সুবিশাল ‘ডিফেন্স পার্ক’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অসম সরকার। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বাবলম্বিতা এবং রাজ্যে শিল্প ও কর্মসংস্থানের বিশাল ক্ষেত্র প্রস্তুত করতেই এই প্রতিরক্ষা পার্ক নির্মাণের রূপরেখা তৈরি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, মঙ্গলবার অসম কেবিনেটের এই বৈঠক রাজ্যের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত সার্বিক চেহারায় এক বিরাট পরিবর্তন আনতে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।





