অযোধ্যায় রামমন্দিরে কোটি টাকার প্রণামী কাণ্ডে দেশজুড়ে বিতর্ক সমালোচনার ঝড়! প্রতিদিন ৫ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কংগ্রেসের তোপ

এই অভিযোগ সামনে আসতেই শুধু শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভূমিকা নিয়েও সরব হয়েছে কংগ্রেস। মঙ্গলবার অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির সদর দফতরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে কংগ্রেসের সোশ্যাল মিডিয়া বিভাগের প্রধান সুপ্রিয়া শ্রীনেত একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই রামমন্দির নির্মাণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

ভূমিপুজো, রামলালার প্রাণপ্রতিষ্ঠা, ধ্বজা উত্তোলন, ট্রাস্ট গঠন এবং ট্রাস্ট সদস্য নির্বাচন, সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তাই আজ যখন সেই মন্দিরের প্রণামী চুরি ও আর্থিক অনিয়ম নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন উঠছে, তখন প্রধানমন্ত্রীর সম্পূর্ণ নীরবতা আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

কংগ্রেসের অভিযোগ, এই চুরির বিষয়টি নতুন নয়। মহীপাল নামে এক কর্মী প্রথম অনিয়মের বিষয়টি সামনে এনে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা চুরি হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগের তদন্ত করার পরিবর্তে তাঁকেই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। কংগ্রেসের বক্তব্য, আরও দু’জন কর্মী একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন এবং তাঁদেরও চাকরি হারাতে হয়েছে।

বিরোধীদের প্রশ্ন, কেন অভিযোগকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হল? কী এমন তথ্য চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছিল? সুপ্রিয়া শ্রীনেত আরও দাবি করেন, রামমন্দিরে ভক্তদের দেওয়া বহু মূল্যবান সামগ্রীরও কোনো সঠিক হিসাব নেই। সিন্ধি সমাজের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাঁদের দেওয়া প্রায় ২০০ কিলোগ্রাম রুপোর কোনো রসিদ বা নথি নেই। ব্যবসায়ী মহলের প্রশ্ন, তাঁদের দেওয়া সোনা কোথায় গেল? করসেবকদের অভিযোগ, প্রায় ১,২৫০টি সোনা ও রুপোর রামশিলা, হনুমানজির মূর্তি, রামলালার পালঙ্ক সহ বহু মূল্যবান সামগ্রী আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এসব সামগ্রী ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাইয়ের হেফাজতেই জমা পড়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাই তাঁর বিরুদ্ধে কেন মামলা দায়ের করা হচ্ছে না এবং কেন তাঁকে রক্ষা করা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তুলেছে কংগ্রেস।

এদিকে তদন্তের অগ্রগতিও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে ২৭ জুন পদত্যাগের পর প্রথমবার তদন্তকারীদের মুখোমুখি হন চম্পত রাই। টানা দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একই সঙ্গে প্রাক্তন ট্রাস্টি অনীল মিশ্রকেও জেরা করা হয়েছে। পরে তদন্তকারী দল একটি ব্যাংকে গিয়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের লেনদেনও খতিয়ে দেখে। যদিও চম্পত রাই সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতেই প্রকৃত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তবে বিরোধীরা এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। কংগ্রেসের দাবি, ট্রাস্টের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা লবকুশ মিশ্র নামে এক ব্যক্তিকে প্রণামী গণনার কাজে নিয়োগ করা হয়েছিল। তদন্তে তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় ১২ লক্ষ টাকা উদ্ধার হয়েছে বলে অভিযোগ। এমনকি টাকা গোবরের মধ্যে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। বিরোধীদের বক্তব্য, এত বড় আর্থিক অনিয়মের ঘটনায় কেবল কয়েকজন নিম্নস্তরের কর্মীকে গ্রেপ্তার করে প্রকৃত দায়ীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে।

কংগ্রেস আরও দাবি করেছে, বর্তমানে যেসব চুরির তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে, সেগুলি মূলত সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া ঘটনাগুলির ভিত্তিতে। কিন্তু যেসব ঘটনা ক্যামেরায় ধরা পড়েনি, সেই সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ কত, তার কোনো হিসাব নেই। তাদের মতে, ভূমিপুজো থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে কত অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী আত্মসাৎ হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।

এই কারণেই কংগ্রেস সুপ্রিম কোর্টের একজন বর্তমান বা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির তত্ত্বাবধানে বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি)-এর মাধ্যমে গোটা ঘটনার তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, এটি শুধু একটি আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নয়; কোটি কোটি ভক্তের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। তাই সত্য সামনে আনা এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনা জরুরি। এই বিতর্কে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে মন্তব্য করেছেন ।

তিনি কটাক্ষ করে বলেন, ট্রাস্টে একজন মুসলিম সদস্য থাকলে হয়তো তাঁকেই দোষী দেখিয়ে এনকাউন্টার বা বুলডোজারের রাজনীতি করা হত। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরেও নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই সমস্ত অভিযোগ বর্তমানে রাজনৈতিক দলগুলির বক্তব্য ও তদন্ত-সংক্রান্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সামনে এসেছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে এখনও কোনো চূড়ান্ত রায় হয়নি এবং তদন্ত প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। ফলে অভিযোগগুলির সত্যতা বিচারাধীন। আইন অনুযায়ী, আদালতে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যায় না।

তবুও এই বিতর্ক এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে, যে রামমন্দির কোটি কোটি মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও ভক্তির প্রতীক, সেখানে প্রণামী ও দানের অর্থ নিয়ে যদি এত বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে, তবে তার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্ত হওয়া কি অপরিহার্য নয়? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে এবং সত্য উদঘাটনের স্বার্থে তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 

Related Posts

দেশের বড় শহরেও মিলছে না কর্মসংস্থান, বাড়ছে বেকারত্ব!

এনএসও-র সমীক্ষায় বড় শহরের হতাশাজনক চিত্র, ১০ লক্ষাধিক জনসংখ্যার শহরেই বেকারত্ব ৪.৯% বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ উন্নত পরিকাঠামো, আধুনিক শিল্প, বহুজাতিক সংস্থার উপস্থিতি, উচ্চ বেতনের চাকরির সম্ভাবনা এবং উন্নত…

দিল্লির সরকারি হাসপাতালেই ৬৫০ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম কেলেঙ্কারির অভিযোগ, ভিজিল্যান্স তদন্তে গ্রেপ্তার দুই শীর্ষকর্তারা

হাসপাতালগুলিতে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনায় ব্যাপক দুর্নীতি! তদন্তে উঠে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ জুলাইঃ দেশের রাজধানী দিল্লির সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঘিরে সামনে এসেছে এক বিস্ফোরক দুর্নীতির…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *