১২ বছরে ১৭ কোটিরও বেশি কর্মসংস্থান!

বিশেষ করে কর্মসংস্থান নিয়ে জেন জি এর ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং বিরোধীদের লাগাতার সমালোচনার মাঝেই এনডিএ সাংসদদের বৈঠকে এই কর্মসংস্থান রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ করেন কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্য। তাঁর দাবি, কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বনিযুক্তির ক্ষেত্রে মোদী সরকারের আমলে যে পরিবর্তন এসেছে, তা স্বাধীনতার পর অন্যতম বড় রূপান্তর।

মন্ত্রী জানান, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এর তথ্য অনুযায়ী দেশে ১৭ কোটিরও বেশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ, গড় হিসাবে প্রতি বছর প্রায় ১.৭ কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। সরকারের দাবি, এই সাফল্য ইউপিএ সরকারের ২০০৪-২০১৪ সময়কালের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। সেই সময় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির গতি মন্থর ছিল এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি বলে দাবি করেন মন্ত্রী।

কেন্দ্রের দাবি, বর্তমানে দেশের বেকারত্বের হার ৩.১ শতাংশ, যা বিশ্বের গড় ৪.৮ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। বিশ্বব্যাঙ্ক এবং পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে এর তথ্য উদ্ধৃত করে সরকার জানিয়েছে, জি-২০ দেশগুলির তুলনায়ও ভারতের কর্মসংস্থানের চিত্র যথেষ্ট ইতিবাচক। মনসুখ মাণ্ডব্যর মতে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি যুব সমাজের দক্ষতা উন্নয়নেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে যুবকদের কর্মসংস্থানের হার ৪১.৪ শতাংশেরও বেশি, আর স্নাতকদের কর্মসংস্থানযোগ্যতা ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সরকারের বক্তব্য, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘স্টার্ট-আপ ইন্ডিয়া’, ‘প্রধানমন্ত্রী মুদ্রা যোজনা’, ‘বিশ্বকর্মা যোজনা’ এবং ‘লখপতি দিদি’-র মতো কর্মসূচি। এই প্রকল্পগুলির মাধ্যমে স্বনিযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উদ্যোক্তা তৈরির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, এর ফলে লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণী শুধু চাকরিপ্রার্থী নন, বরং চাকরি প্রদানকারী হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করছেন।

কেন্দ্র সম্প্রতি ২ লক্ষ কোটি টাকার একটি বিশেষ কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় ৪.১ কোটিরও বেশি যুবকের জন্য কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ এবং সংগঠিত ক্ষেত্রে চাকরির সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী বিকশিত ভারত রোজগার যোজনা’র মাধ্যমে ৩.৫ কোটিরও বেশি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সরকারের দাবি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়েছে অবকাঠামো উন্নয়নে রেকর্ড মূলধনী বিনিয়োগ। রেলপথ, জাতীয় সড়ক, মেট্রো রেল, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, নগরোন্নয়ন ও অন্যান্য বৃহৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের ফলে প্রায় ৫.৮৮ কোটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এছাড়া উৎপাদন ও পরিষেবা দুই ক্ষেত্রেই কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎপাদন শিল্পে কর্মরত জনশক্তির অংশগ্রহণ বেড়ে ২৫.১৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বহু উন্নত দেশের সমপর্যায়ে রয়েছে বলে সরকারের দাবি। সরকার জানিয়েছে, কর্মচারী ভবিষ্যনিধি সংস্থা র আওতায় নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান এবং কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে সংগঠিত কর্মসংস্থানের পরিধিও সম্প্রসারিত হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ যুবককে শিল্পক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছে কেন্দ্র।

মনসুখ মাণ্ডব্যর দাবি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সুফল সমাজের প্রতিটি স্তরে পৌঁছেছে। নীতি আয়োগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ২৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার বাইরে উঠে এসেছেন। একই সঙ্গে মাথাপিছু পারিবারিক ভোগব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও বড় অগ্রগতির দাবি করেছে কেন্দ্র।

২০১৫ সালে যেখানে মাত্র ২৫ কোটি মানুষ (১৯ শতাংশ) কোনও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় ছিলেন, ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে ১০১ কোটিরও বেশি (৬৮.৪ শতাংশ) হয়েছে। সরকারের দাবি, এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিক সামাজিক সুরক্ষা সংস্থা র সম্মানজনক পুরস্কারও অর্জন করেছে।

যদিও সরকারের এই পরিসংখ্যানকে সামনে রেখে নিজেদের সাফল্যের দাবি জোরালো হয়েছে, তবুও কর্মসংস্থান নিয়ে বিরোধী দলগুলির সমালোচনা এবং তরুণ প্রজন্মের একাংশের অসন্তোষ এখনও অব্যাহত। বিশেষ করে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বিলম্ব, সরকারি চাকরিতে শূন্যপদ, বেসরকারি ক্ষেত্রে নিয়োগের গতি এবং কর্মসংস্থানের গুণগত মান নিয়ে নানা প্রশ্ন এখনও উঠে আসছে।

ফলে কেন্দ্রের এই কর্মসংস্থান রিপোর্ট কার্ড নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করলেও, বাস্তবে কর্মসংস্থানের চিত্র নিয়ে বিতর্ক আপাতত থামছে না। আগামী দিনে সরকারের ঘোষিত কর্মসূচিগুলি কতটা বাস্তবায়িত হয় এবং তা দেশের বিপুল সংখ্যক কর্মপ্রত্যাশী যুবকের জীবনে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।

Related Posts

‘পড়বে ভারত, এগোবে ভারত’ কেবল বিজ্ঞাপনেই, সরকারি শিক্ষার করুণ দশায় পিষে যাচ্ছে গরিবের সন্তান

একজন শিক্ষকের ঘাড়ে আস্ত স্কুলের বোঝা চাপিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ  “পড়বে ভারত, তবেই এগোবে ভারত” এই স্লোগান বহু…

রামমন্দির নির্মাণে ব্যয় তিনগুণ! ৮০০ কোটি থেকে ২,২০০ কোটি প্রাক্তন হিসাবরক্ষকের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ

প্রণামী চুরি ধরা পড়েছিল ২০২১ সালেই, তথ্য ও প্রমাণ জমা মহিপাল সিংয়ে, খতিয়ে দেখছে বিশেষ তদন্তকারী দল বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ অযোধ্যার রামমন্দিরকে ঘিরে বহু প্রতীক্ষিত স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলেও এবার…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *