অবিরাম বৃষ্টিতে বারবার পাহাড় ধস ও রেললাইনের নিচের মাটি ধুয়ে যাওয়ায় ব্যাহত পুনরুদ্ধার কাজ
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৬ আগষ্টঃ অবিরাম ভারী বৃষ্টি যেন নতুন করে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের (এনএফআর) লামডিং–বদরপুর পাহাড়ি রেলপথের নিউ হারাঙ্গাজাও এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামতির কাজ কার্যত প্রকৃতির প্রতিকূলতার কাছে বারবার থমকে যাচ্ছে। একদিকে টানা বর্ষণ, অন্যদিকে পাহাড় ধস, পাথর গড়িয়ে পড়া এবং মাটি সরে যাওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
ফলে কবে এই গুরুত্বপূর্ণ রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে যাত্রী, ব্যবসায়ী মহল এবং গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। রেল সূত্রে জানা গেছে, নিউ হারাঙ্গাজাওয়ের ১১৮/১–৩ কিলোমিটার অংশে প্রবল বর্ষণের জেরে রেললাইনের নিচের মাটি সম্পূর্ণ ধুয়ে গিয়েছে। এতে রেললাইন ঝুঁকিপূর্ণ ও অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে জরুরি ভিত্তিতে পুনর্গঠন ও মেরামতির কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু প্রকৃতির প্রতিকূল আচরণ সেই কাজকে বারবার ব্যাহত করছে।
বর্তমানে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের প্রকৌশল, ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্মাণ বিভাগের শতাধিক কর্মী এবং বিশেষজ্ঞ দল দিন-রাত এক করে কাজ করছেন। ভারী ক্রেন, এক্সকাভেটর, ডাম্পারসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে বড় বড় পাথর ফেলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ শক্তিশালী করা, নতুন করে মাটি ভরাট, পাহাড়ের ঢাল স্থিতিশীল করা এবং রেললাইন পুনরায় সমতল করার কাজ চলছে। কিন্তু প্রতিবারই প্রবল বৃষ্টির পর পাহাড়ের নতুন অংশ ধসে পড়ছে এবং সদ্য সম্পন্ন হওয়া কাজের বড় অংশই আবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে মেরামতির কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।
প্রকৌশলীদের মতে, পাহাড়ি অঞ্চলে মাটি অতিরিক্ত জল শোষণ করায় ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সেই কারণেই আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে স্থায়ীভাবে রেললাইন পুনর্নির্মাণ করা অত্যন্ত কঠিন। কর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ চালিয়ে গেলেও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েই প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা হচ্ছে। এই লামডিং–বদরপুর পাহাড়ি রেলপথ শুধু একটি সাধারণ রেললাইন নয় বরং এটি বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং মণিপুরকে দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা একমাত্র ব্রডগেজ রেল সংযোগ। ফলে এই রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধুমাত্র যাত্রী পরিষেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার উপর।
হাজার হাজার যাত্রী তাঁদের নির্ধারিত যাত্রা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। বহু মানুষ চিকিৎসা, চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা এবং অন্যান্য জরুরি কাজে ভ্রমণ করতে না পেরে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, নির্মাণসামগ্রী, সিমেন্ট, লোহা, জ্বালানি, ওষুধ এবং শিল্পকারখানার কাঁচামাল পরিবহণও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারে বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহ কমে গিয়ে মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগ সার্বক্ষণিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। বিশেষজ্ঞ দল নিয়মিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পর্যবেক্ষণ করছে এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মেরামতির কৌশলও বদলানো হচ্ছে। রেল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়েছে, শুধু মেরামতির কাজ শেষ হলেই ট্রেন চলাচল শুরু করা হবে না। সম্পূর্ণ রেললাইন স্থিতিশীল হওয়া, প্রযুক্তিগত পরীক্ষায় নিরাপদ বলে প্রমাণিত হওয়া এবং একাধিক নিরাপত্তা পরিদর্শন সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পরই যাত্রী ও পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে। নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনও ধরনের আপস করা হবে না বলেও পুনরায় জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
এদিকে, প্রতি বর্ষাতেই একই ধরনের বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রেল অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে। প্রায় প্রতিবছরই পাহাড় ধস, রেললাইন বসে যাওয়া, পাথর গড়িয়ে পড়া এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা ঘটছে। ফলে বিকল্প রেলপথ নির্মাণের দাবি এখন আরও জোরালো হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী সংগঠন, নাগরিক মঞ্চ এবং রেলকর্মী ইউনিয়ন চন্দ্রনাথপুর হয়ে লঙ্কা–শিলচর নতুন ব্রডগেজ রেললাইন দ্রুত নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে।
তাঁদের মতে, বর্তমান পাহাড়ি রুটের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বড় ঝুঁকি। একটি বিকল্প রেলপথ তৈরি হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ও বরাক উপত্যকা, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও মণিপুরের সঙ্গে দেশের বাকি অংশের যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব হবে। পাশাপাশি পণ্য পরিবহণ, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং জরুরি পরিষেবাও নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাওয়া যাবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদেরও অভিমত, উত্তর-পূর্ব ভারতের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং কৌশলগত অবস্থানের কথা বিবেচনা করে একাধিক বিকল্প রেল করিডর গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নও ত্বরান্বিত হবে। এই মুহূর্তে অবশ্য সবকিছুই নির্ভর করছে আবহাওয়ার উপর।
বৃষ্টি কমলে পূর্ণমাত্রায় পুনরায় মেরামতির কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী রেল কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে দ্রুত নিরাপত্তা পরীক্ষা সম্পন্ন করে এই গুরুত্বপূর্ণ রেলপথে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। বর্ষার প্রকোপ কবে কমবে, ধসের আশঙ্কা কবে কাটবে এবং কবে আবার শিস দেবে ট্রেন সেই উত্তর খুঁজেই এখন অপেক্ষায় বরাক উপত্যকা সহ সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের লক্ষ লক্ষ মানুষ।






