ছাত্র লাঞ্ছনা ও বেহাত ভবিষ্যৎ, মন্ত্রীর ইস্তফায় কি মুছবে কাঠামোগত ব্যাধি?

কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তার ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগরদের দাবির মুখে কীভাবে সাড়া দিল? দিল্লির রাজপথ সাক্ষী থাকল টিয়ার গ্যাসের বিষাক্ত ধোঁয়া, জলকামানের জলীয় চাবুক আর পুলিশের নির্মম লাঠিচার্জের। যে হাতে কাল স্টেথোস্কোপ ওঠার কথা ছিল, সেই হাত ঢেকে গেল রবারের গুলির ক্ষত ও রক্তে। গণতান্ত্রিক ভারতের এই দৃশ্য কেবল লজ্জাজনকই নয়, বরং এক গভীর ও বিপজ্জনক সংকেত বহন করে, রাষ্ট্র আজ নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের যৌক্তিক দাবি শোনার ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে, আর দমনপীড়নকেই সবচেয়ে সহজ ও দ্রুত সমাধানের পথ বানিয়ে নিয়েছে।

তীব্র আন্দোলনের মুখে আর গণমাধ্যমের প্রবল রাজনৈতিক চাপে অবশেষে পিছু হটতে বাধ্য হয় কেন্দ্র। শিক্ষা মন্ত্রকের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে, গঠন করা হয় পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে উচ্চপর্যায়ের ‘বিশেষ টাস্ক ফোর্স’। আপাতদৃষ্টিতে একে আন্দোলনকারীদের জয় মনে হতে পারে, কিন্তু আসল প্রশ্নটি থেকে যায়।

এতে কি সংকটের মূল উপড়ে ফেলা সম্ভব? নাকি এটি শুধুই রাজনৈতিক ড্যামেজ কন্ট্রোল বা ক্ষোভের আগুনে সাময়িক জল ঢালার কৌশল? বাস্তবতা হলো, নিট-ইউজি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ভুল বা কয়েকজন অসাধু ব্যক্তির কারসাজি নয়। এটি আসলে দেশের শিক্ষাকাঠামোয় গত এক দশক ধরে জমা হওয়া চরম অবহেলা, আশঙ্কাজনক আর্থিক ছাঁটাই এবং রাষ্ট্রীয় নীতিগত দেউলিয়াপনার এক নগ্ন ও বীভৎস বহিঃপ্রকাশ।

প্রায় ২০ লক্ষ পরীক্ষার্থী, যাদের সিংহভাগই সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের। এই পরীক্ষার পেছনের গল্পটি শুধু কয়েক হাজার পৃষ্ঠা মুখস্থ করার নয়, এর পেছনে লুকিয়ে থাকে বহু পরিবারের বহু বছরের ত্যাগ ও কান্না। সন্তানের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নপূরণে বাবা নিজের শেষ এক চিলতে জমি বিক্রি করেছেন, মা গয়না বন্ধক রেখেছেন কিংবা মাথার ওপর চড়া সুদের ঋণের বোঝা চেপেছে।

বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, অপরিসীম মানসিক চাপ ও বিপুল আর্থিক বিনিয়োগের শেষ ফল যখন জানতে পারা যায় প্রশ্নপত্র আগেই বিক্রি হয়ে গেছে কোটি টাকায়, তখন মেধা ও সততার আত্মসংযম ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক। রাষ্ট্র যখন এই মেধা বিক্রির কালো বাজারকে রুখতে পারে না, তখন তরুণ সমাজের বিদ্রোহ কেবল এক পরীক্ষার দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পরিণত হয় পুরো ব্যবস্থার ওপর চূড়ান্ত আস্থাহীনতায়।

ঘটনাটিকে শুধুই আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা টেকনিক্যাল ত্রুটি বলে চালিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছে কেন্দ্র। অথচ প্রকৃত সংকট লুকিয়ে আছে সরকারি ব্যয়ের খাতায়। ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে রাজ্যগুলির মোট খরচের ৪.৬% বরাদ্দ ছিল শিক্ষা খাতে। ২০২৫-২৬ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.৫% এ। কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষার অংক কাগজে-কলমে বাড়লেও মোট সরকারি খরচের নিরিখে তার ভাগ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.৬%। এই ভয়াবহ বাজেট ছাঁটাইয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ে পরীক্ষা পরিচালনার মতো সংবেদনশীল জায়গায়।

পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থাগুলিতে উন্নত সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রশ্নপত্রের ত্রিস্তরীয় এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল সুরক্ষা এবং দক্ষ ও সৎ জনবল নিয়োগের জন্য যে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন, বরাদ্দের অভাবে তা মিলছে না। ফলে প্রযুক্তিগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে মাফিয়াচক্র ও প্রশ্ন ফাঁসকারী সিন্ডিকেট প্রতিবছর ছড়ি ঘোরাচ্ছে।

সরকারি ব্যবস্থার এই পরিকল্পিত কিংবা অপরিকল্পিত ব্যর্থতার শূন্যস্থান পূরণ করেছে এক সর্বগ্রাসী বেসরকারি কোচিং শিল্প। দেশের বড় বড় শহর আজ কার্যত একেকটি ‘কোচিং হাবে’পরিণত হয়েছে, যা মূল শিক্ষা ব্যবস্থার সমান্তরাল এক কোটি টাকার সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। সরকারি স্কুল ও কলেজগুলো যখন প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো ও আধুনিকতার অভাবে ধুঁকছে, তখন বাজার সেই সুযোগ লুফে নিয়ে শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তরিত করেছে।

গত এক দশকে ভারতীয় পরিবারগুলির গড় আয় বছরে প্রায় ১১.৯% বৃদ্ধি পেলেও, শিক্ষার পেছনে খরচ বেড়েছে প্রতি বছর ১৫.৭% হারে। বর্তমানে একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার তাদের মোট আয়ের প্রায় ৩% শুধু সন্তানের টিউটোরিয়াল বা কোচিংয়ের পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। সংবিধানের ‘মৌলিক অধিকার’ হিসেবে ঘোষিত শিক্ষা আজ বাজারে চড়া দামে বিক্রি হওয়া এক বিলাসবহুল পণ্যে পরিণত হয়েছে। যার টাকা আছে সে পরিষেবা কিনতে পারছে, আর যার নেই, তার মেধা সিস্টেমের চাকা পিষে ফেলছে।

শিক্ষায় এত বিশাল পরিবারগত বিনিয়োগের পরও মেলা ফল একেবারেই হতাশাজনক। দেশজুড়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের সংখ্যা হু-হু করে বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু ডিগ্রি পেলেও কর্মসংস্থানের মুখ দেখতে পাচ্ছে না তরুণ প্রজন্ম। গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত কয়েক বছরে সাধারণ স্নাতকদের গড় আয়ের মান উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তফসিলি জাতি ও উপজাতিভুক্ত শিক্ষিত তরুণদের ক্ষেত্রে এই অর্থনৈতিক বৈষম্যের হার আরও প্রকট। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি হাতে বেরোনোর এক বছরের মধ্যে স্থায়ী ও উপযুক্ত বেতনের চাকরি পাচ্ছেন খুব সামান্য শতাংশ শিক্ষার্থী।

ফলে উচ্চশিক্ষা আজ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্তরণের পথ না হয়ে, এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তার ফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই অনিশ্চিত ও দিশাহীন অবস্থায় মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাগুলিই তরুণ মেধার কাছে নিজেদের ভাগ্য বদলানোর এবং দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরোনোর শেষ খড়কুটো। সেই খড়কুটোতেও যখন দুর্নীতির আগুন লাগে, তখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি পুঞ্জীভূত ক্ষোভ রাজপথে বিস্ফোরিত হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় অবশিষ্ট থাকে না।

আজ প্রশ্ন উঠেছে, যদি শিক্ষাব্যবস্থায় উন্নত প্রযুক্তি, কঠোর নজরদারি ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হতো, তবে কি বারবার এই জাতীয় অপরাধ ঘটত? শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, দু-চারজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মচারীকে গ্রেপ্তার বা মন্ত্রী রদবদল করে এই গভীর ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ও সাইবার নিরাপত্তা, প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে কেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিরাপদ ও স্বচ্ছ এনক্রিপশন প্রসেস।

পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থাগুলির প্রশাসনিক স্বচ্ছতা মূল্যায়নের জন্য নিরপেক্ষ তদারকি কমিটি। ভারতের শিক্ষানীতিতে বলা জিডিপির ৬%বরাদ্দ কাগজে না রেখে বাস্তবায়িত করা। একটি জাতির সার্বিক বিকাশ কেবল শত কোটি টাকার এক্সপ্রেসওয়ে, সুউচ্চ মেগা স্ট্রাকচার বা শিল্পাঞ্চল নির্মাণের ফিতায় মাপা যায় না। রাষ্ট্রের আসল ভিত্তি তৈরি হয় তার শ্রেণীকক্ষে, তার পরীক্ষাগারে। আজকের এই আশাহত ছাত্রসমাজই আগামী দিনের চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, প্রধান বিচারপতি কিংবা নীতি-নির্ধারক।

তাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে সাধারণ কোনো প্রশাসনিক গলদ হিসেবে দেখলে রাষ্ট্র ভুল করবে। এটি বছরের পর বছর ধরে শিক্ষা খাতে চলা অবহেলার এক সতর্কবার্তা। সরকার যদি সত্যিই বিশ্বমঞ্চে এক শক্তিশালী ভবিষ্যতের ভারত গড়ে তুলতে চায়, তবে শিক্ষাকে খরচ হিসেবে না দেখে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে শুরু করতে হবে।

মন্ত্রী বদলে ক্ষোভের আঁচ হয়তো সাময়িক প্রশমিত হবে, কিন্তু ভিত না বদলালে আগামী দিনে আবার নতুন প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে, আবারও তরুণদের রক্ত ঝরবে দিল্লির রাজপথে, এবং আবারও এক নতুন প্রজন্মের মেধা অকালে ঝরে যাবে। কারণ, যে রাষ্ট্র তার শিক্ষায় বিনিয়োগ কমাতে থাকে, সে আসলে কেবল তার বর্তমানকে নয়, নিজের ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারের অতলে ঠেলে দেয়।

Related Posts

পাথারকান্দিতে ১২ দিনের শিশুকন্যাকে কুয়োয় ফেলে হত্যা! তদন্তের মুখে মায়ের অসঙ্গতিপূর্ণ বয়ান

অপশক্তির দোহাই দিয়ে উত্তর গোপালপুরে শিশু হত্যা? চাঞ্চল্যকর ঘটনায় চিরুনি তল্লাশিতে শীর্ষ পুলিশ প্রশাসন বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ আগষ্টঃ কচি গলার আধো-আধো কান্না কিংবা একটুকরো নিষ্পাপ হাসি নিয়ে যে ঘরে…

বন্যাকবলিত চার জেলার পড়ুয়াদের ইউনিফর্ম কিনতে ৭ কোটিরও বেশি টাকা বরাদ্দ, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিশেষ ঘোষণা

ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলগুলির সংস্কারেও বিশেষ আর্থিক সহায়তা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ আগষ্টঃ বন্যার ভয়াবহ ধাক্কায় বিপর্যস্ত আপার আসামের চার জেলার শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে বড় উদ্যোগ নিল অসম সরকার। শিবসাগর, চরাইদেউ, গোলাঘাট…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *