এক বছরে ১৪,৫৯৬.৭৮ কোটি টাকার ৬৩.৫ লক্ষ টন চাল ইথানল কারখানায়, রাজ্যসভায় কেন্দ্রের চাঞ্চল্য তথ্য
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ১আগষ্ট, ২০২৬: দেশের কৃষকদের কাছ থেকে ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে (এমএসপি) বিপুল ব্যয়ে চাল কিনছে ভারতীয় খাদ্য কর্পোরেশন (এফসিআই)। কিন্তু সেই চালেরই একটি বড় অংশ পরে ইথানল উৎপাদনকারী ডিস্টিলারিগুলোর কাছে অধিগ্রহণমূল্যের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে। রাজ্যসভায় কেন্দ্র সরকারের লিখিত জবাবে প্রকাশিত এই তথ্যকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, এটি কি কেবল উদ্বৃত্ত মজুত ব্যবস্থাপনার কৌশল, নাকি পরোক্ষভাবে শিল্পকে সুবিধা দেওয়ার একটি নীতি?
ভোক্তা বিষয়ক, খাদ্য ও গণবণ্টন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী নিমুবেন জয়ন্তিভাই বাম্ভানিয়া রাজ্যসভায় সাংসদ অশোক সিংহের প্রশ্নের উত্তরে জানান, ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র এক বছরের মধ্যে এফসিআই তাদের গুদাম থেকে ৬৩.৫ লক্ষ মেট্রিক টন চাল ইথানল উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর কাছে সরবরাহ করেছে। এই চালের মোট আর্থিক মূল্য ১৪,৫৯৬.৭৮ কোটি টাকা।
তবে বিতর্কের মূল কারণ বিক্রির পরিমাণ নয়, বরং বিক্রিমূল্য। সরকার নিজেই জানিয়েছে, এই সময়ে ইথানল কারখানাগুলোর কাছে চাল বিক্রি হয়েছে প্রতি কুইন্টাল ২,২৫০ থেকে ২,৩২০ টাকা দরে। অথচ একই সময়ে এফসিআইয়ের গড় অধিগ্রহণমূল্য ছিল ৩,৭২০ থেকে ৩,৮৮৯ টাকা প্রতি কুইন্টাল। অর্থাৎ কৃষকের কাছ থেকে যে দামে চাল সংগ্রহ করা হয়েছে, তার তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম দামে তা শিল্পে বিক্রি করা হয়েছে।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই হিসাব কেবল অধিগ্রহণমূল্যের। এর সঙ্গে যদি গুদামজাতকরণ, পরিবহণ, সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় যুক্ত করা হয়, তাহলে প্রকৃত অর্থনৈতিক ব্যয় আরও অনেক বেশি। সরকার অবশ্য সংসদে স্পষ্টভাবে দাবি করেছে, ইথানল উৎপাদনকারী সংস্থাগুলিকে কোনও ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে না। তাদের বক্তব্য, ওপেন মার্কেট সেল স্কিম (ডোমেস্টিক)-এর নির্ধারিত মূল্যে চাল বিক্রি করা হয়েছে। কিন্তু অধিগ্রহণমূল্যের তুলনায় এত কম দামে বিক্রির কারণ সম্পর্কে সরকার কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি। এই নীরবতাই নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
রাজ্যসভায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইথানল উৎপাদনের জন্য চাল বরাদ্দের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে হরিয়ানা, যেখানে গেছে ৮,৪৪,১৪১ মেট্রিক টন চাল। এরপর রয়েছে উত্তরপ্রদেশ (৮,৩৮,৬৪৫ মেট্রিক টন), পাঞ্জাব ও হিমাচল প্রদেশ মিলিয়ে (৬,৫৮,৯৫২ মেট্রিক টন), পশ্চিমবঙ্গ (৫,৮৪,৬৭২ মেট্রিক টন) এবং মধ্যপ্রদেশ (৪,৩২,৪৮৫ মেট্রিক টন)। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চালের মূল্য ছিল প্রতি কুইন্টাল ২,২৫০ টাকা। পরে ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তা বাড়িয়ে ২,৩২০ টাকা করা হয়। আবার ২০২৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২,৩৯০ টাকা।
কিন্তু এই মূল্যবৃদ্ধির পরও এফসিআইয়ের প্রকৃত ব্যয়ের সঙ্গে বিশাল ব্যবধান থেকেই যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই লোকসানের ভার শেষ পর্যন্ত বহন করবে কে? কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং একটি তালিকাভুক্ত কৃষিভিত্তিক সংস্থার স্বাধীন পরিচালক জি. কে. সুদের মতে, অর্থনৈতিক ব্যয়ের তুলনায় কম দামে চাল বিক্রি করাকে ভর্তুকি না বললেও বাস্তবে এর প্রভাব একই। তার মতে, ২০২৬-২৭ সালের ইথানল সরবরাহ বর্ষে সরকার ৭২ লক্ষ মেট্রিক টন চাল ইথানল উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ করেছে। প্রতি টনের মূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ২৩,৯০০ টাকা, অথচ এর অর্থনৈতিক ব্যয় প্রায় ৪৩,১০০ টাকা। এই বিশাল পার্থক্য যদি বাজেটে আলাদাভাবে দেখানো না হয়, তবে তা শেষ পর্যন্ত খাদ্য ভর্তুকির বোঝা হিসেবেই জনগণের ওপর বর্তাবে।
এফসিআই বহু বছর ধরেই ন্যূনতম সহায়ক মূল্যে কৃষকদের কাছ থেকে উন্মুক্তভাবে চাল সংগ্রহ করে আসছে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, তেলেঙ্গানা, উত্তরপ্রদেশ, ছত্তীসগড়সহ বিভিন্ন রাজ্যে কৃষকরা যত চাল বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন, তার বড় অংশই এফসিআই কিনে নেয়। কিন্তু জনবণ্টন ব্যবস্থা (পিডিএস), মধ্যাহ্নভোজন, খাদ্য নিরাপত্তা আইন এবং অন্যান্য কল্যাণমূলক প্রকল্পে যত চালের প্রয়োজন, তার তুলনায় সংগ্রহের পরিমাণ বহু বছর ধরেই বেশি। ফলে এফসিআইয়ের গুদামে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত চাল জমে থাকে, যা অনেক সময় নির্ধারিত বাফার স্টকের দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যায়।
সরকারের মতে, এই উদ্বৃত্ত মজুত কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করতে ইথানল উৎপাদনে চাল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভারতে ধান উৎপাদনে বিপুল সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হয়। এই ফসল চাষে প্রচুর জল লাগে। এরপর সরকার উচ্চ এমএসপিতে সেই ধান কিনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। আবার সেই চালই অনেক কম দামে শিল্পে বিক্রি করা হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, যদি শেষ পর্যন্ত শিল্পকারখানার জন্য কম দামে চাল ছেড়ে দেওয়াই উদ্দেশ্য হয়, তাহলে এত বিপুল সরকারি ব্যয়ে উৎপাদন ও সংগ্রহের বর্তমান মডেল কতটা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই?
সরকার আরও জানিয়েছে, ইথানল উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ চাল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দুটি ঘটনা ইতিমধ্যেই ধরা পড়েছে। সংশ্লিষ্ট দুই ডিস্টিলারির বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের কাছে চাল বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে কারা এই নিয়ম ভেঙেছে, তাদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। এতে স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কারণ, সরকারি সম্পদের অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িত প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পেট্রোলে ইথানল মিশ্রণের হার বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কেন্দ্র সরকার দ্রুত এগোচ্ছে। সেই লক্ষ্যে আখ, ভুট্টা, ক্ষতিগ্রস্ত শস্যের পাশাপাশি এখন এফসিআইয়ের উদ্বৃত্ত চালও বড় কাঁচামাল হয়ে উঠছে। কিন্তু একদিকে যেখানে দেশের কোটি কোটি মানুষ এখনও সরকারি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে খাদ্যশস্যকে জ্বালানির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করার নীতি কতটা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তিযুক্ত, তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
রাজ্যসভায় প্রকাশিত তথ্য অন্তত এটুকু স্পষ্ট করেছে যে, বিষয়টি আর শুধুমাত্র খাদ্য মজুত ব্যবস্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, ভর্তুকি, সরকারি ব্যয়, জ্বালানি নীতি এবং আর্থিক স্বচ্ছতার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আগামী দিনে এই নীতি নিয়ে সংসদ, অর্থনীতিবিদ এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আরও বিস্তৃত বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।






