বরাকের ভাষা আন্দোলনের বিস্মৃত ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ, কলকাতা-ঢাকা-আসামে হবে শুটিং, সুযোগ পাবেন স্থানীয় শিল্পীরাও
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২১ মেঃ বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক অমর নাম কমলা ভট্টাচার্য। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে ১৯৬১ সালের ঐতিহাসিক আন্দোলনে যিনি আত্মবলিদান দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন বাংলা ভাষা আন্দোলনের একমাত্র নারী শহিদ। সেই সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, বেদনা ও বাঙালির ভাষিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এবার উঠে আসতে চলেছে রূপালী পর্দায়।
বুধবার শিলচর শহরের ইলোরা হোটেলে এক আবেগঘন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হলো পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র কমলার নির্মাণ পরিকল্পনা। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নির্মাতা, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের বক্তব্যে যেন বারবার ফিরে আসে একটাই কথা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে জীবন্ত করে তুলতেই এই প্রয়াস। আয়োজকদের মতে, ‘কমলা’কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়; এটি হবে বাঙালির আত্মপরিচয়, ভাষা-অধিকার এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক দলিল।
চলচ্চিত্রটির প্রযোজনা করছে এসএস এন্টারটেইনমেন্ট। সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার নির্বাহী সুমন চক্রবর্তী ও সুদীপ্ত ঘোষ জানান, বহুদিন ধরেই বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। সেই স্বপ্ন বাস্তব রূপ পেতে চলেছে কমলার মাধ্যমে। তাঁদের কথায়, শুধু ১৯৬১ সালের শিলচরের ঘটনা নয়, ১৯৫২ সালের ঢাকার ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলা ভাষার জন্য আত্মত্যাগের যে দীর্ঘ ইতিহাস, সেই আবেগ ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতাকেই আমরা চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে চাই।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতের চলচ্চিত্র নির্মাতা রামেশ ভান্দারি এবং ‘বীরকন্যা প্রীতিলতা’চলচ্চিত্রের পরিচালক। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে বাংলা ভাষার সংগ্রামের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব। বাংলাদেশের এক খ্যাতিমান পরিচালক বলেন, বাংলা ভাষার ইতিহাস কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সমগ্র বাঙালি জাতিসত্তার অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এই ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া আমাদের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা।
নির্মাতারা স্পষ্ট করে জানান, ‘কমলা’কোনও তথ্যচিত্র নয়; এটি হবে কাহিনি নির্ভর পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। যেখানে ঐতিহাসিক বাস্তবতার ভিত্তিতে তুলে ধরা হবে ভাষা আন্দোলনের আবেগ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগের কাহিনি। বিশেষভাবে গুরুত্ব পাবে ১৯৬১ সালের ১৯ মে শিলচর রেলস্টেশনে পুলিশের গুলিতে নিহত ১১ ভাষা শহিদের সংগ্রাম ও আত্মবলিদান। চলচ্চিত্রের কাহিনির কেন্দ্রে থাকবেন ভাষা শহিদ কমলা ভট্টাচার্য।
নির্মাতাদের বক্তব্যে উঠে আসে, বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে কমলা ভট্টাচার্যের আত্মত্যাগ আজও পর্যাপ্তভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত হয়নি। সেই বিস্মৃত অধ্যায়কে নতুনভাবে সামনে আনতেই কমলার পরিকল্পনা। তাঁদের দাবি, এই চলচ্চিত্র কেবল ইতিহাস বলবে না, দর্শকের আবেগকেও নাড়া দেবে।
চলচ্চিত্রটির শুটিং হবে শিলচর, কলকাতা ও ঢাকা সহ বাংলা ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে। ঐতিহাসিক পরিবেশ ও সময়কে বাস্তবসম্মতভাবে ফুটিয়ে তুলতে বিশেষ গবেষণাও চালানো হচ্ছে বলে জানান নির্মাতারা। ভাষা আন্দোলনের নথি, প্রত্যক্ষদর্শীদের স্মৃতিচারণ, সাহিত্য ও গবেষণা উপাদান সংগ্রহ করে চিত্রনাট্য প্রস্তুতির কাজ চলছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, চলচ্চিত্রটিতে স্থানীয় শিল্পীদেরও গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ দেওয়া হবে। শিলচরের নাট্যকর্মী, তরুণ অভিনেতা-অভিনেত্রী ও সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য মাসিক অডিশনের আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি কলকাতা ও ঢাকাতেও শিল্পী বাছাই পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। নির্মাতাদের মতে, বরাক উপত্যকার ভাষা, উচ্চারণ, সংস্কৃতি ও আবেগকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পর্দায় তুলে ধরতে স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিচালক প্রদীপ ঘোষ, অভিনেতা সুদীপ্ত ঘোষ, আম্রপালি দত্ত, প্রদীপ নাথ, সুমন চক্রবর্তী সহ বিশিষ্ট সমাজকর্মী স্বর্ণালী চৌধুরী, কবি-লেখিকা অঞ্জু এন্দো এবং সুনীল রায়। বক্তারা সকলেই একবাক্যে বলেন, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরতে সাংস্কৃতিক মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা পালন করতে পারে। সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্বে ভাষা শহিদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
উপস্থিতদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কমলা ভট্টাচার্যের আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ উঠতেই। আয়োজকদের আশা, ‘কমলা’চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর নতুন প্রজন্ম শুধু ইতিহাস জানবে না, ভাষার জন্য আত্মত্যাগের মূল্যও উপলব্ধি করবে। বরাক উপত্যকার সাংস্কৃতিক মহলেও ইতিমধ্যেই এই ঘোষণাকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন অবহেলিত ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস এবার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন করে আলোচনায় আসবে কমলার হাত ধরে।





