হ্যাশট্যাগ রাজনীতিতেই কি আটকে গেল বিরোধী আন্দোলন?

২০১৪ সালে কেন্দ্রে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক বড় পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের দাবি, একসময় মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, কৃষক সমস্যা কিংবা জনজীবনের বিভিন্ন সংকটকে কেন্দ্র করে বিরোধীদের রাজপথে নামতে দেখা যেত। কংগ্রেস আমলে সামান্য পেট্রোল-ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি হলেও হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক নিয়ে আন্দোলনে নামতেন বিরোধী নেতারা। রাস্তায় বসে বিক্ষোভ, রেল অবরোধ, থানা ঘেরাও, এমনকি জলকামান ও লাঠিচার্জের মুখেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার বহু নজির ছিল।

কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে বলে অভিযোগ। এখন বিরোধীদের অধিকাংশ প্রতিবাদ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যম, সাংবাদিক বৈঠক কিংবা টেলিভিশনের বিতর্কসভায়। সাধারণ মানুষের একাংশের অভিযোগ, বাস্তব সমস্যার বিরুদ্ধে সরাসরি জনআন্দোলনের বদলে এখন ট্রেন্ডিং হ্যাশট্যাগ বা ফেসবুক পোস্টই যেন বিরোধী রাজনীতির প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠেছে। ফলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিরোধী রাজনীতির দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বিজেপি কিন্তু রাতারাতি দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়নি।

দীর্ঘদিন ধরে রাস্তায় নেমে আন্দোলন, সংগঠন গড়ে তোলা এবং তৃণমূলস্তরে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার ফলেই দলটি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। বিরোধী অবস্থায় থাকাকালীন বিজেপির নেতাকর্মীদের বহুবার গ্রেফতার হতে হয়েছে, আন্দোলনে বাধার মুখে পড়তে হয়েছে, তবুও তারা সংগঠনকে সক্রিয় রেখেছিল। সেই তুলনায় বর্তমান বিরোধীদের আন্দোলনী ধার অনেকটাই ভোঁতা হয়ে পড়েছে বলে মত উঠছে বিভিন্ন মহলে।

যদিও বিরোধী নেতাদের বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার বিরোধী কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে রাখার জন্য প্রশাসনিক চাপ, তদন্তকারী সংস্থার ব্যবহার এবং সংবাদমাধ্যমের একাংশকে কাজে লাগাচ্ছে। বহু বিরোধী নেতা প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেন যে, দেশের বড় অংশের সংবাদমাধ্যম এখন গদি মিডিয়ায় পরিণত হয়েছে এবং সরকারের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন সংগঠিত করতে গেলেই নানা ধরনের বাধা সৃষ্টি করা হয়। তাঁদের দাবি, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ক্ষেত্র ক্রমশ সংকুচিত করা হচ্ছে।

তবে সেই যুক্তিকেও প্রশ্নের মুখে তুলছেন সমালোচকরা। তাঁদের বক্তব্য, যদি সত্যিই বিরোধীদের লড়াই করার সুযোগ না-ই থাকে, তাহলে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা কোথায়? আবার সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণভাবে বিরোধীদের প্রত্যাখ্যান করলে বিভিন্ন নির্বাচনে বিরোধী দলগুলির উল্লেখযোগ্য ভোট পাওয়ার ব্যাখ্যাও কী? ভারত জোড়ো যাত্রা বা ন্যায় যাত্রার মতো কর্মসূচির বাস্তব রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। সমালোচকদের মতে, এসব কর্মসূচি জনমনে স্থায়ী ছাপ ফেলতে পারেনি, কারণ তা মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ও বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

একাংশের মতে, বর্তমান বিরোধী রাজনীতির বড় সমস্যা হলো, তারা সাধারণ মানুষের মৌলিক সমস্যা থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, কৃষক সমস্যা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা বা শিক্ষার মতো ইস্যুতে ধারাবাহিক আন্দোলনের বদলে অনেক সময় আন্তর্জাতিক বা বিমূর্ত রাজনৈতিক ইস্যুতে বেশি সরব হতে দেখা যায় বিরোধীদের। ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষ কিংবা নিম্নবিত্ত ভোটারদের বড় অংশ সেই বক্তব্যের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক খুঁজে পান না।

রাজনৈতিক যোগাযোগের এই ফাঁকই বিজেপির পক্ষে বড় সুবিধা তৈরি করছে বলে মত বিশ্লেষকদের। অন্যদিকে বিজেপি নিয়মিতভাবে তৃণমূলস্তরে সংগঠন মজবুত করেছে। বুথভিত্তিক সংগঠন, সামাজিক প্রকল্পের প্রচার, সরাসরি জনসংযোগ এবং স্থানীয় ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে দলটি অনেক বেশি সক্রিয় বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। ফলে বিরোধীরা যখন মূলত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সীমাবদ্ধ, তখন বিজেপি মাঠের রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

এমনও চর্চা রাজনৈতিক মহলে শোনা যাচ্ছে যে, শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষের মধ্যেই এক ধরনের অলিখিত সমঝোতা কাজ করছে। অভিযোগ উঠছে, প্রকৃত গণআন্দোলনের বদলে অনেক সময় শুধুই রাজনৈতিক নাট্যমঞ্চ তৈরি করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে পথে নামতে উস্কানি দেওয়া হলেও নেতৃত্বের বড় অংশ নিরাপদ দূরত্বে থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। ফলে আন্দোলনের সময় সাধারণ মানুষই লাঠিচার্জ, গ্রেফতার কিংবা প্রশাসনিক চাপে পড়েন, অথচ রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরে সেই পরিস্থিতিকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যবহার করে বলে অভিযোগ উঠছে।

এই কারণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরোধী রাজনীতির প্রতি আস্থার সংকট বাড়ছে বলে মনে করছেন অনেকে। কারণ মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, দুর্নীতি, স্বাস্থ্যসঙ্কট কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বৃদ্ধির মতো সমস্যায় সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভুগলেও, সেই ক্ষোভকে শক্তিশালী গণআন্দোলনে রূপ দিতে বিরোধীরা কার্যত ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে একাংশের ধারণা, বর্তমানে বিরোধী রাজনীতির বড় অংশ শুধুমাত্র প্রতীকী প্রতিবাদ ও সস্তা রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

রাজনৈতিক মহলের মতে, যদি বিরোধীরা সত্যিই জনমানসে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখতে চায়, তাহলে সামাজিক মাধ্যমের গণ্ডি ছেড়ে আবার রাজপথে ফিরতে হবে। মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে বাস্তব সমস্যাকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কারণ ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, শুধু ডিজিটাল প্রচার নয়, শেষ পর্যন্ত জনতার আস্থা অর্জন করতেই হয় মাঠে নেমে, মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে।

Related Posts

डॉलर के दबाव में रिकॉर्ड निचले स्तर पर भारतीय रुपया

96.96 के स्तर तक पहुंची भारतीय मुद्रा, विदेशी निवेश निकासी और पेट्रोल-डीजल की कीमतों में बढ़ोतरी से आम लोगों की मुश्किलें बढ़ीं बराकबाणी डिजिटल डेस्क, सिलचर, 21 मई: अंतरराष्ट्रीय आर्थिक…

सड़कें खाली, क्या अब सोशल मीडिया तक ही सिमट गई है विपक्ष की राजनीति?

महंगाई और बेरोजगारी से जनता परेशान है, लेकिन सड़कों पर कोई मजबूत और प्रभावी आंदोलन दिखाई नहीं दे रहा। बराकबाणी डिजिटल डेस्क, 21 मई: भारत के वर्तमान राजनीतिक परिदृश्य में…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *