স্মার্টফোন হাতে পেলেই সবাই সাংবাদিক নয়! মতপ্রকাশের অধিকার থাকলেই সাংবাদিক দাবি করা যাবে না, সাংবাদিকদের নিয়ে কড়া বার্তা শীর্ষ আদালতের

প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তি এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে শুক্রবার সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত একটি হাই-প্রোফাইল মামলার শুনানি চলাকালীন এই ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, পেশাদার সাংবাদিক, ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর এবং সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের কাজের ধরন ও পরিচয়ের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ও নীতিগত ফারাক নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

পেশাদার সাংবাদিকতা বনাম ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েশন, সর্বজনীন মতপ্রকাশের অধিকারে সাংবাদিকদের সুরক্ষা জটিল হচ্ছে আদালতে। ঘটনার সূত্রপাত দিল্লির নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তরের বাইরে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি এবং বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করে এক বিশাল বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই উত্তাল প্রতিবাদের খবর সংগ্রাহক হিসেবে উপস্থিত একাধিক সাংবাদিকদের ওপর দিল্লি পুলিশি হয়রানি, হেনস্থা এবং অমানবিক আচরণের গুরুতর অভিযোগ ওঠে। বাদ যাননি মহিলা সাংবাদিকরাও।

এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাকারীদের পক্ষে সওয়াল করেন দেশের প্রখ্যাত আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং। তিনি আদালতে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে যুক্তি দেন যে, স্বাধীন সংবাদ পরিবেশনা গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ। তাই দেশজুড়ে সাংবাদিকদের কাজের স্বাধীনতা ও শারীরিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে জাতীয় স্তরে একটি নির্দিষ্ট প্রোটোকল ও নির্দেশিকা তৈরি করা জরুরি। মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ স্বীকার করে নেয় যে, খবর সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা বিধান অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জরুরি একটি বিষয়। তবে বর্তমান ডিজিটাল যুগে পেশাদার সাংবাদিক এবং সাধারণ কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের আলাদা করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মূলধারার স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকদের মতো যদি যে কেউ নিজেকে সাংবাদিক দাবি করে আইনি সুরক্ষার ছাতা পেতে চান, তবে প্রশাসনের পক্ষে প্রকৃত সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেওয়া জটিল হয়ে পড়ে। পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব ও নীতিমালা থাকে, যা সোশ্যাল মিডিয়ার স্বাধীন ইনফ্লুয়েন্সার বা ভিডিও মেকারদের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। সাংবাদিকের পরিচয় ও তাঁদের কাজের ধরন সম্পর্কে কেন্দ্রীয় স্তরে স্পষ্ট আইন ও নির্দেশিকা থাকা প্রয়োজন।

এদিকে, শুনানির দিন এই মামলায় এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ জারি করেছে শীর্ষ আদালত। খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘাতের জেরে এক মহিলা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশের এক আধিকারিক জাতপাতের ভিত্তিতে আপত্তিকর মন্তব্য ও অপমান করার গুরুতর ধারায় মামলা রুজু করেছিলেন। পাল্টা হিসেবে ওই মহিলা সাংবাদিকও দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনে জানান, প্রতিবাদের খবর কাভার করার সময় পুলিশ আধিকারিকরা তাঁর ওপর যৌন নিপীড়ন ও শারীরিক হেনস্থা চালিয়েছে। এই ক্রস-এফআইআরকে কেন্দ্র করে তোলপাড় শুরু হয় রাজধানীর প্রশাসনিক অলিন্দে।

শুক্রবারের শুনানিতে শীর্ষ আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মহিলা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ কোনোপ্রকার কঠোর বা পীড়নমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবে না। সংবাদ সংগ্রহের সময় সংবাদকর্মীদের নিরাপত্তা, পেশাগত স্বীকৃতি নিশ্চিতকরণ এবং জাতীয় প্রোটোকল তৈরির আবেদনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকার এবং দিল্লি পুলিশের স্পষ্ট মতামত জানতে চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই পর্যালোচনার পর এখন কেন্দ্র কীভাবে ‘সাংবাদিক’-এর সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ করে এবং পেশাদার সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কী নীতি গ্রহণ করে, সেদিকেই নজর গোটা দেশের গণমাধ্যম জগতের।

Related Posts

পুজোর আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হল মৃত্যুমিছিলে! চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৭ জনের মৃত্যুর খবর

বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড়, পিছন থেকে ধাক্কা, তার পরই হুড়োহুড়ি! বহু আহতের অবস্থা সংকটজনক, মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ পুজোর আনন্দ, আলোর ঝলকানি আর…

২০২৩ সালেই কি শুরু হয়েছিল ‘নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণের’ আসল খেলা?

বিরোধীদের ঘুম ভাঙতে দেরি, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ঘিরে প্রশ্নের মুখে গণতন্ত্রের নিরপেক্ষতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ ভারতের গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং অবাধ ও…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *