৫ কোটি টাকার ভুয়া আইটিসি কেলেঙ্কারি: শিলচরের শান্তনালা ভবনে জিআইটি-র ঝটিকা অভিযানে ফাঁস চাঞ্চল্যকর তথ্য।

মেসার্স এসজেএমএ কামাখ্যা স্টিল প্রাইভেট লিমিটেড নামের এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ উঠেছে, তা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়, বরং এটি একটি সংঘবদ্ধ অর্থনৈতিক অপরাধের কালো অধ্যায়। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার সুধীর রামসাগর চৌধুরী এবং সঞ্জয় জয়সওয়ালের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের জাল ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট (আইটিসি) এবং বিশাল অঙ্কের কর ফাঁকির বিস্ফোরক অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পথে। প্রশ্ন উঠছে, সাধারণ মানুষের চোখ এড়িয়ে কীভাবে দিনের পর দিন এই চক্রটি ফুলেফেঁপে উঠেছিল?

তদন্তের গভীরে প্রবেশ করে গোয়েন্দারা যা জানতে পেরেছেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। মেসার্স এসজেএমএ কামাখ্যা স্টিল প্রাইভেট লিমিটেড মূলত লৌহ, ইস্পাত এবং মেটালিক স্ক্র্যাপ বা ভাঙারির ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই ব্যবসার মূল ফুয়েল বা কাঁচামাল অর্থাৎ স্ক্র্যাপের বিশাল চালান আসার কথা প্রতিবেশী দুই পাহাড়ি রাজ্য মণিপুর এবং মিজোরাম থেকে।

কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় ধোঁয়াশা। প্রাথমিক তদন্ত এবং বাজোপ্ত নথিপত্রের ভিত্তিতে জিআইটি টিমের জোরালো সন্দেহ, মণিপুর ও মিজোরাম থেকে বাস্তবে যে পরিমাণ স্ক্র্যাপ আসার কথা বলা হয়েছে, তার সিংহভাগই কেবল কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ, পণ্যের কোনো বাস্তব বা শারীরিক অস্তিত্ব ছাড়াই ভুয়া ইনভয়েস, ফেক বিল এবং জাল চালানের পাহাড় তৈরি করা হয়েছিল।

এই কাল্পনিক বা পেপার ট্রানজাকশনের মাধ্যমেই সরকারের চোখে ধুলো দিয়ে কোটি কোটি টাকার জাল আইটিসি (ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট) ক্লেইম করা হচ্ছিল। এর ফলে একদিকে যেমন জালিয়াতির মাধ্যমে পকেট ভারী হচ্ছিল অভিযুক্তদের, অন্যদিকে সরাসরি কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছিল ভারতীয় অর্থনীতি।

বুধবারের সেই গোপনীয় ও ঝটিকা অভিযান বরাক উপত্যকার কর ফাঁকিবাজ মহলে চরম ত্রাসের সৃষ্টি করেছে। শান্তনালা ভবনের চার দেয়ালের মধ্যে গড়ে ওঠা এই ব্যবসার অফিসটিতে যখন গোয়েন্দারা প্রবেশ করেন, তখন সেখানে থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই ম্যারাথন তল্লাশিতে প্রতিষ্ঠানের সমস্ত হিসাবের খাতা, কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক, ব্যাংক লেনদেনের বিবরণী এবং বহু গোপন নথি বা চালানের স্তূপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়।

তদন্তকারী দলের সদস্যরা একযোগে সমস্ত ডিজিটাল ও পেপার প্রমাণের ওপর সিলমোহর লাগিয়ে তা নিজেদের হেফাজতে নিয়েছেন। এই নথিগুলোই এখন প্রমাণ করবে যে, কীভাবে সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে এবং আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা কামানো হচ্ছিল।

গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে বরাক উপত্যকায় এটি ছিল জিএসটি ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট ইউনিটের ষষ্ঠ বড় এবং অত্যন্ত সফল অভিযান। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট যে, দক্ষিণ অসম বা বরাক উপত্যকাকে কর ফাঁকি দেওয়ার নিরাপদ করিডোর বানিয়ে ফেলেছিল কিছু অসাধু সিন্ডিকেট।

দিনের পর দিন কর ফাঁকি দিয়ে সৎ ব্যবসায়ীদের বাজার থেকে হটিয়ে একচেটিয়া অনৈতিক সাম্রাজ্য বিস্তার করাই ছিল এদের মূল লক্ষ্য। জিআইটি-র এই সাঁড়াশি অভিযান বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, সরকারের নীতিনির্ধারক ও কর গোয়েন্দারা এখন ঘুমিয়ে নেই। শিলচরের এই ঘটনা গোটা অঞ্চলের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বিরাট সতর্কবার্তা।

৫ কোটি টাকার এই কর ফাঁকির হিসাবটি কেবল একটি প্রাথমিক অংক মাত্র। তদন্তকারী দল যেভাবে এই চক্রের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ভুয়া শেল কোম্পানিগুলোর জাল বিস্তার পরীক্ষা করছে, তাতে এই কেলেঙ্কারির পরিধি আগামী দিনে বহুগুণ বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মণিপুর ও মিজোরামের কোন কোন অসাধু চক্র বা ভুয়া ডিলারের নাম এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে যুক্ত, তা উন্মোচন করতে এখন আন্তঃরাজ্য তদন্তের পথ প্রশস্ত হচ্ছে।

জিআইটি সূত্রে জোরালো ইঙ্গিত মিলেছে যে, আগামী দিনগুলোতে বরাক উপত্যকার কোণায় কোণায় এই ধরনের ঝটিকা অভিযান আরও তীব্র থেকে তীব্রতর করা হবে। শুধু কামাখ্যা স্টিল নয়, উপত্যকায় লুকিয়ে থাকা অন্য সমস্ত স্ক্র্যাপ সিন্ডিকেট এবং সন্দেহভাজন ব্যবসাগুলো এখন ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ জিএসটি ইন্টেলিজেন্সের কালো তালিকায় রয়েছে।

আইনের চোখে ফাঁকি দিয়ে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন যে চিরস্থায়ী হতে পারে না, সুধীর চৌধুরী ও সঞ্জয় জয়সওয়ালের এই ঘটনা তারই এক নির্মম পরিণতি। বরাকের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে যারা এভাবে তিলে তিলে ফোকলা করে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে এই কঠোর বার্তা সাধারণ মানুষ ও সৎ ব্যবসায়ীদের মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেও, এই কেলেঙ্কারির শেষ কোথায় গিয়ে ঠেকে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Related Posts

পুজোর আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হল মৃত্যুমিছিলে! চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৭ জনের মৃত্যুর খবর

বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড়, পিছন থেকে ধাক্কা, তার পরই হুড়োহুড়ি! বহু আহতের অবস্থা সংকটজনক, মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ পুজোর আনন্দ, আলোর ঝলকানি আর…

২০২৩ সালেই কি শুরু হয়েছিল ‘নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণের’ আসল খেলা?

বিরোধীদের ঘুম ভাঙতে দেরি, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ঘিরে প্রশ্নের মুখে গণতন্ত্রের নিরপেক্ষতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ ভারতের গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং অবাধ ও…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *