বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ আকাশভাঙা বৃষ্টিতে ফুঁসে উঠেছে সিংলা নদী, আর তার সঙ্গে তলিয়ে গেছে প্রশাসনের সাজানো প্রতিশ্রুতির তাসের ঘর! টানা মুষলধারে বৃষ্টিপাতের ফলে নদীর জলের স্তর আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় অবশেষে জননিরাপত্তার দোহাই দিয়ে বন্ধ ঘোষণা করা হলো শ্রীভূমি (সাবেক করিমগঞ্জ) জেলার আনিপুর বাজার সংলগ্ন একমাত্র অস্থায়ী কাঠের সেতুটি।
আসাম সরকারের গণপূর্ত বিভাগের আর. কে. নগর আঞ্চলিক রোড সাব-ডিভিশনের সহকারী কার্যনির্বাহী প্রকৌশলী সুব্রত দাস স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সিংলা নদীর তলদেশ ও বাঁধের ওপর অতিরিক্ত জলের চাপে অস্থায়ী কাঠামোর সেতুটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। তাই ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে সব ধরনের যান ও পথচারী চলাচল অবিলম্বে বন্ধ ঘোষণা করা হলো। আদেশ অমান্য করা বিপজ্জনক এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে।
সরকারি একটি বিজ্ঞপ্তির এক আঁচড়ে রাতারাতি থমকে গেছে সিংলা নদীর দুই পারের প্রায় ৫০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। নদীর এপার-ওপারের যোগাযোগ ব্যবস্থা এখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, আজকের এই মানবিক বিপর্যয় কি কেবলই প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল, নাকি প্রশাসনিক উদাসীনতা ও রাজনীতিকদের ফাঁপা প্রতিশ্রুতির এক মর্মান্তিক ফসল?
ঘটনার সূত্রপাত আজ থেকে প্রায় ছয় মাস আগে। অঞ্চলের বহু পুরনো মূল স্থায়ী সেতুটি হঠাৎ ধসে পড়লে সিংলা পারের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সে সময় তীব্র জনরোষ সামাল দিতে এবং নদীর দুই পারের জীবনরেখা সাময়িকভাবে সচল রাখতে তড়িঘড়ি করে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি নড়বড়ে কাঠের অস্থায়ী সাঁকো।
সে সময় দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে জনসমক্ষে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে বিশাল আশ্বাস দিয়েছিলেন রাজ্যের পূর্তমন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল। গম্ভীর গলায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, দুর্ভোগ সাময়িক। মাত্র এক মাসের মধ্যে এই স্থানে একটি অত্যাধুনিক ও মজবুত বেইলি ব্রিজ নির্মাণ করে দেওয়া হবে, যাতে স্থায়ী সেতু না হওয়া পর্যন্ত মানুষ অনায়াসে চলাচল করতে পারেন।
মন্ত্রীর সেই চটকদার প্রতিশ্রুতির পর একে একে ছ’ছটি মাস কেটে গেছে। কিন্তু আনিপুরের সিংলা নদীতে বেইলি ব্রিজের একটি নাট-বল্টুরও দেখা মেলেনি! বেইলি ব্রিজ তো দূরের কথা, মূল সেতু পুনর্নির্মাণের যে শামুক-গতি দেখা যাচ্ছে, তাতে আজ পর্যন্ত নদীর বুকে কেবল কয়েকটা পিলারের পাইলিংয়ের কাজই খুঁটি গেড়ে বসে রয়েছে।
এলাকাবাসীর তীব্র ক্ষোভ ও কটাক্ষ, মন্ত্রীর কথার কোনো অবশিষ্ট মূল্য এই অঞ্চলে নেই। উনার এক মাসের প্রতিশ্রুতি আজ ছয় মাসের জলে ভেসে গেছে। রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মাইক ফুঁকিয়ে ভাষণ দেওয়া সহজ, কিন্তু নদী পারের হাজার হাজার মানুষের নিত্যদিনের যন্ত্রণা বোঝার মানসিকতা এই সরকারের নেই।
এতদিন ঝুঁকি জেনেও ছোট যানবাহন, মোটরসাইকেল আরোহী এবং পথচারীরা কাঠের ওই জরাজীর্ণ সাঁকোটি দিয়ে কোনোমতে যাতায়াত করছিলেন। কিন্তু ১ সেপ্টেম্বর থেকে সরকারি নোটিশে সেতু পুরোপুরি সিলগালা করে দেওয়ায় গোটা এলাকা এখন এক অচলাবস্থায় পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ ও করুণ দৃশ্য দেখা যাচ্ছে জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে। কোনো হৃদরোগী বা গর্ভবতী নারীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য এলাকা থেকে অ্যাম্বুলেন্স বের করার কোনো সুযোগ নেই। বিকল্প পথ হিসেবে যে ই অ্যান্ড ডি বাঁধের কাঁচা রাস্তাটি নির্দেশ করা হয়েছে, তা যেমন বহুদূরবর্তী, তেমনই অত্যন্ত সংকীর্ণ ও কাদা-জলে বিপজ্জনক। সেই সরু পথ দিয়ে কোনো দ্রুতগতির যানবাহন চালানো আত্মহত্যার শামিল। ফলে সামান্য চিকিৎসার অভাবেও যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি জারি করে দায় সেরেছে ঠিকই, কিন্তু নদীর দু’পারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর পারাপারের জন্য কোনো বিকল্প নৌকা বা তাৎক্ষণিক সরকারি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেনি। ফলে চূড়ান্ত বিপাকে পড়ে জীবন বাঁচাতে এবং জীবিকার প্রয়োজনে একপ্রকার বাধ্য হয়েই শয়ে শয়ে মানুষ
এখনও মৃত্যুর মুখে পা বাড়িয়ে সেই অবরুদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সাঁকোর ওপর দিয়েই যাতায়াত করছেন। যেকোনো মুহূর্তে দুর্বল কাঠের কাঠামোটি তীব্র স্রোতে ভেঙে তলিয়ে যেতে পারে সিংলার গর্ভে, ঘটতে পারে সলিলসমাধি। কিন্তু পেটের টানে ও জীবনের তাগিদে মানুষ যেন আজ ভয় পাওয়ার অনুভূতিও হারিয়ে ফেলেছেন।
আনিপুর বাজার ও সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভুক্তভোগী সাধারণ জনগণ এখন আর কোনো মিষ্টি কথায় ভুলতে রাজি নন। স্থানীয় সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে প্রশাসন ও পূর্ত বিভাগকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগামী ১০ দিনের মধ্যে বেইলি ব্রিজের কাজ দৃশ্যমান ও ত্বরান্বিত করতে হবে।
দীর্ঘ ছয় মাসেও কেন মূল সেতুর পাইলিং পার হলো না, তার তদন্ত করে গাফিলতি থাকা ঠিকাদার ও পূর্ত বিভাগের সহকারী কার্যনির্বাহী প্রকৌশলী সুব্রত দাসসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত যাতায়াতের জন্য অবিলম্বে স্থায়ী ও নিরাপদ বিকল্প সরকারি পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে।
জনপ্রতিনিধিদের কথা আর কাজের এই আকাশ-পাতাল ফারাক শ্রীভূমির সাধারণ মানুষ আর কত দিন নিরবে সহ্য করবে? সিংলা নদীর ঘোলা জল হয়তো বর্ষা শেষে নেমে যাবে, কিন্তু প্রশাসনিক উদাসীনতা ও প্রতিশ্রুতির খেলাপের কারণে জনমনে যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে, তা সহজে নিভবে না। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই সিংলা নদীর পার থেকেই সরকার বিরোধী এক বৃহত্তর আন্দোলনের সূত্রপাত হবে, এমনটাই হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন আনিপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ।






