সাধারণ মানুষের হাজারের কিস্তিতে মান-সম্মান সাফ, আর ২২ হাজার কোটি লোনে মাফ!

সাধারণ গিগ ওয়ার্কার, সামান্য মাইনের কেরানি কিংবা ছোটোখাটো দোকানদারের জন্য এই দেশে পাওনা আদায়ের নিয়ম অত্যন্ত কঠোর ও নির্দয়। পরিস্থিতি জটিল হলে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের দরজায় এসে লোক জড়ো করার অভিযোগও সামনে আসে। মাসের শেষে হাতে টাকা নেই, ব্যবসায় মন্দা, চাকরি হারানো কিংবা শারীরিক অসুস্থতা কারণ যাই হোক না কেন, ঋণের কিস্তি মিস হলেই ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতার জন্য শুরু হয় চরম আর্থিক ও সামাজিক হয়রানি।

কিন্তু বড় শিল্পগোষ্ঠী কিংবা কর্পোরেট ঋণের ক্ষেত্রে কি নিয়ম আর আইনি প্রক্রিয়ার রূপ সম্পূর্ণ আলাদা? সাম্প্রতিক একটি ঘটনা সেই প্রশ্নই নতুন করে জনপরিসরে সামনে এনে দিয়েছে। ‘জি গ্রুপ’ ও এসেল গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সুভাষ চন্দ্রের ব্যক্তিগত দেউলিয়া-সংক্রান্ত মামলায় ন্যাশনাল কোম্পানি ল ট্রাইব্যুনাল (এনসিএলটি)

সম্প্রতি এমন একটি পরিশোধ পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে, যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই অনুমোদিত পরিকল্পনায় প্রায় ২২,০০৬.৫৭ কোটি টাকার স্বীকৃত দাবির বিপরীতে ঋণদাতাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৬.২৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি দেউলিয়া প্রক্রিয়ার পরিচালনা খরচের জন্য রাখা হয়েছে প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা।

সহজ হিসেবে, ঋণদাতাদের প্রাপ্তি তাদের স্বীকৃত দাবির মাত্র প্রায় ০.০৩ শতাংশ, যেখানে ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির হেয়ারকাট বা লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৯৯.৯৭ শতাংশ। এই বিপুল অঙ্কের ব্যবধানই এখন সর্বস্তরে তীব্র ক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কয়েক হাজার থেকে কয়েক লক্ষ টাকা | তবে বিষয়টি একতরফাভাবে দেখা ঠিক হবে না।

আইনি জটিলতা ও সুভাষ চন্দ্রের পক্ষের দাবি অনুযায়ী, ব্যক্তিগত জামিনদার হিসেবে তাঁর বিরুদ্ধে প্রকৃত দাবির অঙ্ক ২২ হাজার কোটি টাকা নয়, বরং প্রায় ৩,৯৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল দাবির অঙ্ক নিয়েই আদালত ও পক্ষগুলির মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তবুও এনসিএলটি-এর অনুমোদিত পরিকল্পনায় পুনরুদ্ধারের হার যে অস্বাভাবিক রকমের কম তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।

আজ একজন সাধারণ গিগ ওয়ার্কার, ছোট ব্যবসায়ী কিংবা মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী যখন ব্যাঙ্ক থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নেন, তাঁর ঘাড়ে থাকে ইএমআই, সুদ, লেট ফি, পেনাল চার্জ এবং দুর্বল সিবিল স্কোরের ভয়াবহ তরবারি। দু’টি কিস্তি অনিয়মিত হলেই ফোন আসা শুরু হয়। আয় কম বা কোনো কারণে কাজ বন্ধ হয়ে গেলে তারা বাধ্য হয়ে মহাজনি ঋণ বা অ্যাপ-লোনের ফাঁদে পা দেন, যার চড়া সুদের চাপ শোধ করতে করতে পরিবারের স্বাভাবিক জীবনটাই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।

এমনকি কোনো উদ্যমী তরুণ যখন নতুন ব্যবসার স্বপ্নে ব্যাঙ্কে ঋণের আবেদন জানান, তখন নথিপত্রের পাহাড়, আর্থিক ট্র্যাক রেকর্ড, ক্রেডিট হিস্ট্রি এবং জামানত এর দোহাই দিয়ে তাকে ঘুরানো হয়। সরকারি মুদ্রা লোন বা সহজ ঋণ প্রকল্পের কথা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবের ট্রিব্যুনালে সাধারণের প্রবেশপথ অত্যন্ত দুর্গম।

সেখানেই প্রশ্ন উঠছে, যে দেশে একজন সাধারণ মানুষ সামান্য কয়েক লক্ষ টাকা ঋণের জন্য দিনের পর দিন ব্যাঙ্কের দরজায় ধর্ণা দেন, সেখানে বড় কর্পোরেট বা শিল্পপতির বেলায় হাজার হাজার কোটি টাকার দাবির বিপরীতে কীভাবে ৯৯.৯৭% ছাড় বা হেয়ারকাট সম্ভব হয়?

এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এনসিএলটি-এর এই দেউলিয়া প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়েছে ঋণদাতাদের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতিতে নয়। নিয়ম অনুযায়ী আইনি ভোটাভুটিতে প্রায় ৮০.৮১ শতাংশ ভোটিং ভ্যালু এই পরিকল্পনার পক্ষে থাকলেও, বেশ কয়েকটি বড় ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এর তীব্র বিরোধিতা করেছে।

এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক এবং এলআইসি হাউস ফাইন্যান্স ইতিমধ্যেই এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উচ্চতর আইনি মঞ্চ বা আপিল ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ক্যানারা ব্যাঙ্ক ও ইউনিয়ন ব্যাঙ্কও আদালতের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার ইঙ্গিত দিয়েছে।

ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলির মূল প্রশ্ন, ব্যক্তিগত গ্যারান্টারের প্রকৃত সম্পদ ও আর্থিক সামর্থ্য যথাযথ মূল্যায়ন না করে কীভাবে এত কম অর্থে গোটা বিষয়টি রফা করা হলো? ব্যাঙ্কগুলি যে অর্থ ঋণ দেয়, তা কোনো জাদুবলে তৈরি হয় না। সেই অর্থের মূল উৎস হলো দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের রক্তজল করা সঞ্চয়, পেনশন ফান্ড, সেভিংস অ্যাকাউন্ট ও ফিক্সড ডিপোজিট।

যখন বড় ঋণ খেলাপির কারণে ব্যাঙ্কের খাতায় হাজার হাজার কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণ জমা হয় এবং কোটি কোটি টাকা মকুব বা রাইট-অফ করতে হয়, তার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে ব্যাঙ্কের ব্যালান্সশিটে। ক্ষতিপূরণ করতে ব্যাঙ্কগুলি বাধ্য হয়ে, আমানত বা সেভিংস অ্যাকাউন্টে সুদের হার কমিয়ে দেয়।

মিনিমাম ব্যালেন্স না থাকলে দরিদ্র গ্রাহকের থেকে জরিমানা কাটে। বিভিন্ন অনলাইন পরিষেবা ও এটিএম লেনদেনে নতুন নতুন চার্জ চাপায়। অর্থাত্‍, শেষপর্যন্ত বড় শিল্পপতির ঋণের সেই বিপুল অঙ্কের মাশুল পরোক্ষভাবে দিতে হয় সেই সাধারণ ট্যাক্সপেয়ার ও আমানতকারীকেই।

নিঃসন্দেহে, দেউলিয়া আইন (ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপ্সি কোড) তৈরি হয়েছিল কোনো বন্ধ হয়ে যাওয়া বা অলাভজনক ব্যবসাকে দীর্ঘ আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত করে দ্রুত সমাধানের পথ বের করার জন্য। কিন্তু যখন একজন সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র ঋণের কিস্তি আদায়ে সামাজিক ও মানসিক চাপের মুখোমুখি হতে হয়, আর অন্যদিকে হাজার কোটি টাকার ক্ষেত্রে ‘ব্যবসার ঝুঁকি’ বা আইনি রফা’র দোহাই দিয়ে কয়েক কোটিতে রফা হয়,

তখন সেই আইনি কাঠামোর স্বচ্ছতা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক। সুভাষ চন্দ্রের ঘটনা সেই জমে থাকা প্রশ্নকেই ফের উস্কে দিয়েছে। ইএমআই শুধু একটি আর্থিক অঙ্ক নয়, এটি একজন সাধারণ মানুষের সততা, শ্রম এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। সেই ব্যবস্থায় কোটি কোটি টাকার দাবিতে পুনরুদ্ধার যখন ০.০৩ শতাংশে নেমে আসে, তখন মানুষের মনে এই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়,আইন কি সত্‍ ও ক্ষুদ্র মানুষের প্রতি একটু বেশিই কঠোর, আর প্রভাবশালীদের প্রতি অতিরিক্ত নমনীয়?

Related Posts

সত্য এক, মানবতাও এক,  নিউইয়র্কে এক বিশ্ব, এক মানবতার মঞ্চ থেকে বিশ্ববাসীকে ঐক্যের বার্তা দিলেন মোহন ভাগবত

হিন্দুত্বের অর্থ মুসলিমদের বাদ দেওয়া নয়, নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে বার্তা মোহন ভাগবতের বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ “ধর্ম ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মানবতা এক। সত্য একটাই, আর সেই সত্যেরই অবধারিত ফল…

বিকশিত ভারতের স্বপ্নে ঘোর অনিশ্চয়তা ও নৈরাশ্যের আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছে  তরুণদের ভবিষ্যৎ

৩৭ কোটি জেন জির এক-চতুর্থাংশই কাজহীন, শিক্ষাহীন ও প্রশিক্ষণহীন নীতি আয়োগের রিপোর্টে বিস্ফোরক তথ্য বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী এক তরুণ ও উদীয়মান ভারতের উজ্জ্বল…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *