বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৯ আগষ্টঃ মেঘের কোল ঘেঁষে জেগে থাকা এক চিলতে পাহাড়ি স্বর্গ, মেঘালয়। পাহাড়, নদী আর গহীন সবুজের মেলবন্ধনে যে রাজ্যটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেকে আগলে রেখেছে, তার বুক চিরে এখন নামছে এক আশঙ্কাজনক ধস। সেই ধস কোনো পাহাড় ধসে পড়া নয়, সেই ধস সবুজের ক্ষয়ের, এক নীরব বিনাশের।
আর এই মর্মান্তিক সত্যটি কোনো পরিবেশবিদ বা পরিবেশবাদী সংগঠনের তোলা অভিযোগ মাত্র নয়, একেবারে রাজ্য বিধানসভার ভেতরে দাঁড়িয়ে খোদ মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে সাংমার দেওয়া স্বীকারোক্তি। ২০০৯ থেকে ২০২৩ এই ১৪ বছরে মেঘালয় হারিয়েছে প্রায় ৩২৫ বর্গকিলোমিটার বন আচ্ছাদন। ভারতের ফরেস্ট সার্ভের তৈরি ‘ইন্ডিয়া স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট’ এর তথ্য চিত্র সামনে এনে দিয়েছে।
উপরে উপরে মেঘালয়কে দেখলে এখনও মনে হতে পারে সবুজ তো ফুরিয়ে যায়নি! ‘ইন্ডিয়া স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট ২০২৩ জানাচ্ছে, রাজ্যের মোট ২২,৪২৯ বর্গকিলোমিটার ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে অরণ্য ঘিরে রয়েছে প্রায় ১৬,৯৬৬.৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা যা মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৭৫.৬৫ শতাংশ। পরিসংখ্যান বলে, এর মধ্যে প্রায় ৫৯৪.৮৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা রয়েছে অতীব ঘন বন, ৯,০২৩.৮১ বর্গকিলোমিটার মাঝারি ঘন বন এবং ৭,৩৪৮.১৯ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে খোলা বন।
তথ্যটা আপাতদৃষ্টিতে আশার বাণী শোনালেও, এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা আসল ছবিটা কিন্তু উদ্বেগের। মেঘালয়ের পাহাড় এখনও সবুজ ঠিকই, কিন্তু সেই সবুজের গভীরে জন্ম নিয়েছে এক দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ের ক্ষত। ২০১৯ সালেও রাজ্যের বন-আচ্ছাদন ছিল প্রায় ১৭,১১৯ বর্গকিলোমিটার। ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৬,৯৯৬.৮৪ বর্গকিলোমিটারে। আর ২০২৩-এর চূড়ান্ত মূল্যায়নে তা আরও নেমে আসে ১৬,৯৬৬.৮৪ বর্গকিলোমিটারে।
অর্থাৎ, প্রতি মুহূর্তে রাজ্যের মানচিত্র থেকে একটু একটু করে উধাও হয়ে যাচ্ছে শতাব্দীর ঐতিহ্যবাহী অরণ্য। প্রশ্ন উঠছে, ভারতের অন্যতম সবুজ রাজ্য হিসেবে পরিচিত একটি পাহাড়ি অঞ্চলে যদি এভাবে দিন-দুপুরে জঙ্গল সাফ হতে থাকে, তবে এই পাহাড়ের ভবিষ্যৎ ঠিক কী? পাহাড়ি পরিবেশ আর বাস্তুতন্ত্র কি রক্ষা পাবে?
অবশ্য সরকার কিন্তু খাতায়-কলমে হাত গুটিয়ে বসে নেই। মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় দাবি করেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি নানান স্কিমের পাশাপাশি ‘ক্যাম্পা’, ‘মেঘালয় এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন অ্যান্ড রেস্টোরেশন ফান্ড’ এবং ‘মেঘালয় মাইনিং অ্যান্ড মিনারেল রেস্টোরেশন ফান্ড’-এর টাকা খরচ করে চলছে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ অভিযান।
জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে প্রায় ৩,০৬৫.০৯ হেক্টর জমিতে নতুন করে বনসৃজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যার জন্য সরকারি কোশাগার থেকে বরাদ্দ হয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকা। এছাড়া, রাজ্যের প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার দুধারে গাছ লাগানোর এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৯ লক্ষ টাকা।
কিন্তু প্রশাসনিক এই তথাকথিত নিরাময়ের গল্পই সামনে এনে দিচ্ছে আরও বড় এবং মারাত্মক সব প্রশ্ন, যে প্রাকৃতিক অরণ্য শত শত বছর ধরে প্রকৃতি নিজের হাতে গড়ে তুলেছে, কৃত্রিমভাবে কিছু চারাগাছ পুঁতে কি সেই মহীরুহের অভাব সত্যি পূরণ করা সম্ভব? একটি অরণ্য কি কেবলই কটা কাঠ আর গাছের সংখ্যা গণনা? নাকি তা মাটি, জল, বন্যপ্রাণ, অগণিত ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জীববৈচিত্র্য এবং পুরো পাহাড়ি বাস্তুতন্ত্রের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল নেটওয়ার্ক?
একটি প্রাকৃতিক বন গড়ে তুলতে শতক পেরিয়ে যায়। সেখানকার মাটির বিশেষ গঠন, জলধারণের অবিশ্বাস্য ক্ষমতা, এবং পরস্পর-নির্ভরশীল জীববৈচিত্র্য রাতারাতি কোনো প্রকল্পের টাকায় তৈরি হয় না। সরকারি বৃক্ষরোপণ প্রকল্প হয়তো নথিপত্রে কিংবা স্যাটেলাইট ছবিতে সবুজের পিক্সেল বাড়াতে পারে, কিন্তু শতাব্দী প্রাচীন কোনো বনের স্বকীয়তা কিংবা প্রাকৃতিক সুরক্ষা ফিরিয়ে আনতে পারে না। নতুন চারার জঙ্গল আর বহু প্রাচীন স্বাভাবিক অরণ্য দুটো কখনোই এক জিনিস হতে পারে না।
একদিকে উন্নয়নের অপ্রতিরোধ্য চাকা, কয়লা ও খনিজ পদার্থের যথেচ্ছ উত্তোলন, নগরায়ণ এবং রাস্তা সম্প্রসারণ অন্যদিকে অরণ্য সংরক্ষণ। এই দুই বৈপরীত্যের মাশুলই আজ গুণতে হচ্ছে মেঘালয়কে। দীর্ঘ ১৪ বছরে ৩২৫ বর্গকিলোমিটার গভীর অরণ্য হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর কোটি কোটি টাকার নতুন প্রকল্প কতটা কার্যকরী হবে, তা নিয়ে বড়সড় সংশয় রয়েছে।
কারণ, যে গতিতে শতবর্ষের পুরোনো সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে, সেই ক্ষত কি মাত্র কয়েক হাজার হেক্টরের কৃত্রিম চারাগাছ দিয়ে আদৌ মেরামত করা সম্ভব? নাকি উন্নয়নের অবাধ দৌড়ে আর প্রশাসনিক উদাসীনতায় ক্রমশ আরও ফিকে হতে থাকবে মেঘালয়ের সেই বিখ্যাত মেঘ-সবুজের মায়াজাল? সময় আসার আগেই এই উত্তর না খুঁজলে পাহাড় কিন্তু তাঁর নিজের ভাষায় এর জবাব দেবে, আর সেই পরিণতি খুব একটা সুখকর হবে না।



