বিরোধীদের ঘুম ভাঙতে দেরি, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ঘিরে প্রশ্নের মুখে গণতন্ত্রের নিরপেক্ষতা
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ ভারতের গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের অন্যতম প্রধান রক্ষাকবচ। সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষের কাছেই এই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ সেই নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের পদ্ধতি, তাঁদের জবাবদিহি এবং আইনি সুরক্ষা নিয়ে যখন ২০২৩ সালে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাশ হয়েছিল, তখন বিরোধী শিবিরের ভূমিকা কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে আজ নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
অভিযোগ, সেই সময় বিরোধীদের একাংশ বৃহত্তর গণতান্ত্রিক স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আঞ্চলিক আধিপত্য এবং প্রধানমন্ত্রী পদের সম্ভাবনা নিয়েই বেশি ব্যস্ত ছিল। আর সেই রাজনৈতিক অনৈক্যের সুযোগেই কি এমন একটি আইন কার্যকর করার পথ প্রশস্ত হয়েছিল, যার প্রভাব ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিতর্ক তৈরি করেছে?
২০২৩ সালের ঘটনাপ্রবাহের দিকে ফিরে তাকালে প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলির ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু সেই ঐক্যের ভিত কতটা মজবুত ছিল, তা নিয়ে তখন থেকেই সংশয় দেখা দেয়। একাধিক আঞ্চলিক দলের নেতা নিজেদের রাজ্যে রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তিতে জাতীয় নেতৃত্বের দাবিদার হয়ে উঠতে চাইছিলেন।
বিরোধী শিবিরের মধ্যে কে নেতৃত্ব দেবেন, কে প্রধানমন্ত্রীর মুখ হবেন, কার রাজনৈতিক প্রভাব বেশি, এসব প্রশ্নও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। সমালোচকদের অভিযোগ, মোদী সরকারের বিরুদ্ধে একটি সুসংহত রাজনৈতিক লড়াই গড়ে তোলার পরিবর্তে বিরোধীদের একাংশ নিজেদের মধ্যেই নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বিরোধী ঐক্যের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল অভিন্ন কর্মসূচির অভাব। বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলা হলেও নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নে কতটা সমন্বিত অবস্থান নেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বিরোধী নেতারা যদি সময়মতো এই বিষয়গুলিকে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অগ্রাধিকার দিতেন, তবে সংসদে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের সময় সরকারের ওপর আরও কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হতো কি না, সেই প্রশ্ন এখন উপেক্ষা করা কঠিন।
নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন: ২০২৩ সালের সেই বিতর্কিত অধ্যায়
২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে সংসদে পাশ হয় Chief Election Commissioner and Other Election Commissioners (Appointment, Conditions of Service and Term of Office) Act, 2023। এই আইনটি দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে। আইনটি ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে। পরবর্তী সময়ে এর কার্যকর হওয়া এবং বাস্তব প্রয়োগকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরদার হয়।
বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য গঠিত নির্বাচন কমিটির কাঠামো। ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ নির্দেশ দিয়েছিল, সংসদ আইন প্রণয়ন না করা পর্যন্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতি থাকবেন। আদালতের সেই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল নিয়োগপ্রক্রিয়ায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা।
কিন্তু নতুন আইনে সেই কাঠামো পরিবর্তন করা হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী, নিয়োগ-সংক্রান্ত নির্বাচন কমিটিতে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং প্রধানমন্ত্রী মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রী। অর্থাৎ, ভারতের প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার একজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই পরিবর্তনই বিরোধীদের আপত্তির অন্যতম প্রধান কারণ। তাঁদের যুক্তি, নির্বাচন কমিশন যে সংস্থার মাধ্যমে দেশের সরকার নির্বাচিত হওয়ার প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, সেই সংস্থার শীর্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের প্রভাব কমানোর ব্যবস্থা থাকা জরুরি। অথচ নতুন কাঠামোতে তিন সদস্যের কমিটির দু’জনই কার্যত সরকারের পক্ষের প্রতিনিধি। ফলে বিরোধী দলনেতা কমিটিতে থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা কি শুধু নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তির সততা ও পেশাদারিত্বের ওপর নির্ভর করবে, নাকি নিয়োগের পদ্ধতিতেও এমন ভারসাম্য থাকা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষের কাছে প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কমে?
সরকারের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বিষয়ে সংসদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে এবং নতুন আইন সেই সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই তৈরি। কিন্তু বিরোধীদের আপত্তি হলো, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা থাকলেই প্রতিটি ব্যবস্থার গণতান্ত্রিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার শেষ হয়ে যায় না। আইন বৈধ কি না, তার পাশাপাশি আইনটি ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতাকে কতটা সুরক্ষিত করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ধারা ১৬: আইনি সুরক্ষা, না কি জবাবদিহি নিয়ে নতুন প্রশ্ন?
২০২৩ সালের আইনটির আরেকটি আলোচিত বিধান হলো ধারা ১৬। এই ধারায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় তাঁদের দ্বারা সম্পাদিত বা সম্পাদিত বলে বিবেচিত কোনও কাজ, কথা বা সিদ্ধান্তের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের দেওয়ানি ও ফৌজদারি কার্যক্রম থেকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
এই বিধানকে ঘিরে সমালোচকদের প্রশ্ন, নির্বাচন কমিশনের কোনও সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নিয়ে অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকর পথ কতটা উন্মুক্ত থাকবে? বিশেষত, নির্বাচনী আচরণবিধি প্রয়োগ, রাজনৈতিক দলগুলির অভিযোগের নিষ্পত্তি, নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা এবং বিভিন্ন বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে যখন জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয়, তখন আইনি সুরক্ষার সীমা ও পরিধি স্পষ্ট থাকা কি আরও জরুরি নয়?
তবে আইনের বিধানকে সম্পূর্ণ দায়মুক্তি হিসেবে ব্যাখ্যা করাও সঠিক হবে না। ধারা ১৬-র সুরক্ষা নির্বাচন কমিশনারদের সরকারি দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর অর্থ এই নয় যে নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বিচারিক পর্যালোচনার বাইরে চলে যায়, কিংবা সব ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রেই কোনও প্রতিকার পাওয়া অসম্ভব। আইনের প্রকৃত পরিধি, সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রকৃতি এবং প্রযোজ্য অন্যান্য আইনি বিধান বিবেচনা করেই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে বজায় রাখা হবে? নির্বাচন কমিশনারদের যাতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মামলা দিয়ে হয়রানি করা না যায়, সেই উদ্দেশ্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সরকারি দায়িত্বের আড়ালে প্রকৃত অনিয়মের অভিযোগ চাপা পড়ার সুযোগ তৈরি না হওয়াও সমান জরুরি।
এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব সংসদ, সরকার, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলগুলির। অথচ আইন প্রণয়নের সময় যদি রাজনৈতিক বিতর্ক মূল বিষয় থেকে সরে গিয়ে দলীয় শক্তি প্রদর্শন কিংবা পারস্পরিক নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে বৃহত্তর জনস্বার্থের প্রশ্নটি আড়ালে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
বিরোধীরা কি তখন ঘুমিয়ে ছিল?
২০২৩ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আজ যে সমালোচনা সামনে আসছে, তার মূল বক্তব্য হলো—বিরোধী দলগুলি বিপদের গুরুত্ব বুঝতে দেরি করেছিল। একাধিক আঞ্চলিক দলের নেতার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা, জাতীয় নেতৃত্বের প্রশ্নে মতবিরোধ এবং বিভিন্ন রাজ্যে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা বিরোধী ঐক্যের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল বলে সমালোচকদের দাবি।
প্রশ্ন উঠছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা বললেও বিরোধী নেতারা কি নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে নির্বাচনী ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি?
এই অভিযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্য অবশ্যই রয়েছে। তবে বিরোধী দলগুলির প্রত্যেক নেতা বা দল একই অবস্থানে ছিলেন, কিংবা কেউই এই আইন নিয়ে আপত্তি জানাননি, এমন দাবি তথ্যপ্রমাণ ছাড়া করা যায় না। আইনটি নিয়ে বিরোধী দলগুলির আপত্তি, সংসদীয় প্রতিবাদ এবং আইনি চ্যালেঞ্জের ঘটনাও রয়েছে। ফলে সমালোচনার আসল জায়গা হওয়া উচিত প্রতিবাদের কার্যকারিতা, বিরোধী ঐক্যের সীমাবদ্ধতা এবং সংসদীয় বিরোধিতার ফলাফল।
রাজনীতিতে শুধু আপত্তি জানানোই যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের সময় জনমত গঠন, সংসদে কার্যকর বিতর্ক, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতামত সামনে আনা, প্রয়োজনে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া এবং সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা, এসবই বিরোধী রাজনীতির অপরিহার্য দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে কোথায় ঘাটতি ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক আলোচনারই অংশ।
বিরোধীদের রাজনৈতিক শক্তি যদি কেবল নির্বাচনের আগে আসন ভাগাভাগি, জনসভা এবং প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নির্ধারণের আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা রক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলি যথেষ্ট গুরুত্ব পাবে কি? এই প্রশ্নের উত্তর বিরোধী নেতৃত্বকেই দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী পদের স্বপ্ন, নাকি গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব?
বিরোধী শিবিরের নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন নয়। আঞ্চলিক দলের নেতাদের নিজ নিজ রাজ্যে শক্তিশালী জনভিত্তি থাকতে পারে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও থাকতে পারে। কিন্তু জাতীয় স্তরে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার জন্য শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা আঞ্চলিক রাজনৈতিক সাফল্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি, সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা।
২০২৩ সালের ঘটনাপ্রবাহের সমালোচকদের বক্তব্য, বিরোধী নেতাদের একাংশ যদি প্রধানমন্ত্রী পদকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য সমীকরণ তৈরির বদলে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, তদন্তকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা, সংসদীয় জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারকে অগ্রাধিকার দিতেন, তবে বিরোধী রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তে পারত।
তবে বিরোধীদের এই ব্যর্থতার সমালোচনা করতে গিয়ে সরকারের আইন প্রণয়নের দায়িত্ব কিংবা সংশ্লিষ্ট আইনের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনীয়তা কমে যায় না। গণতন্ত্রে সরকারের সিদ্ধান্তের জবাবদিহি এবং বিরোধীদের কার্যকারিতা দুটি পৃথক বিষয়। বিরোধীরা দুর্বল হলে সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক হয়ে যায় না। একইভাবে সরকারের কোনও সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি থাকলেই বিরোধীদের রাজনৈতিক কৌশল সফল হয়েছে, এমনও বলা যায় না।
বরং এই দুই দিককে একসঙ্গে বিচার করাই জরুরি। সরকার কেন এই পরিবর্তন আনল, এর পক্ষে কী যুক্তি দিয়েছে, বিরোধীদের আপত্তির ভিত্তি কতটা শক্তিশালী এবং নতুন ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত—এসব প্রশ্নের উত্তর তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে খুঁজতে হবে।
আইন পাশের সময়কার নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন
নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে শুধু আইনের বিষয়বস্তু নয়, বরং আইনটি প্রণয়নের সময় রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা ও অবস্থানও রয়েছে। কোনও গুরুত্বপূর্ণ আইন সংসদে পাশ হওয়ার পর তার সম্ভাব্য প্রভাব উপলব্ধি করে প্রতিবাদ শুরু হলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, আগে কেন যথেষ্ট প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি?
বিরোধী দলগুলির সংসদীয় কৌশল, যৌথ প্রতিবাদের পরিকল্পনা এবং সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখা দরকার। আইনটি নিয়ে আপত্তি থাকলে সংসদে ধারাভিত্তিক বিতর্ক, সংশোধনী প্রস্তাব, সংসদীয় কমিটির পর্যালোচনা এবং জনমত সংগঠনের মাধ্যমে বিরোধীরা কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছিল, সেই মূল্যায়ন জরুরি।
একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা দরকার যে সংসদে কোনও আইন পাশ হওয়ার অর্থ এই নয় যে সেই আইন নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। গণতন্ত্রে আইন পর্যালোচনা, সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বিচারিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে সংশোধনের দাবি তোলার অধিকার সর্বদাই গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘ঘুমিয়ে থাকার’ অভিযোগ রাজনৈতিক ভাষ্য হিসেবে আকর্ষণীয় হলেও, তার চূড়ান্ত মূল্যায়ন করতে হলে সংসদীয় নথি, দলগুলির আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং আইনটির বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপগুলি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। আবেগনির্ভর অভিযোগের পরিবর্তে তথ্যনির্ভর সমালোচনাই এই বিতর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়
ভারতের নির্বাচন কমিশন পরিচালনা করে লোকসভা, বিধানসভা-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা, রাজনৈতিক দলগুলির আচরণবিধি পর্যবেক্ষণ, নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা এবং নির্বাচনী বিরোধের বিভিন্ন দিক সামলানোর ক্ষেত্রে কমিশনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হলে তার প্রভাব কেবল কোনও একটি রাজনৈতিক দলের ওপর পড়ে না; সমগ্র নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেই অবশ্য কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। অভিযোগের ভিত্তি, প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের যুক্তি এবং প্রযোজ্য আইনি কাঠামো বিচার করা জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়ার কাঠামো এমন হওয়া দরকার, যাতে কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কমে।
এই কারণেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা কতটা থাকবে, বিচারব্যবস্থা বা অন্য কোনও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের প্রয়োজন আছে কি না, এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা কীভাবে বাড়ানো যায়, এসব প্রশ্নের গুরুত্ব অপরিসীম।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শুধু বাস্তব নিরপেক্ষতাই নয়, নিরপেক্ষতার প্রতি জনআস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। সেই আস্থা অর্জনের জন্য নিয়োগপ্রক্রিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা থাকা দরকার। নির্বাচন কমিশনের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলির আস্থা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ ভোটারের আস্থা।
এখন আন্দোলন, কিন্তু প্রশ্ন, আগে কেন নয়?
২০২৩ সালের আইন নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হলে স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী দলগুলির পূর্ববর্তী ভূমিকা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সমালোচকদের প্রশ্ন, যখন নিয়োগ কমিটির কাঠামো পরিবর্তন করা হচ্ছিল, তখনই কি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা যেত না? যখন ধারা ১৬ নিয়ে বিতর্কের সম্ভাবনা ছিল, তখনই কি আইনি বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে দেশজুড়ে সচেতনতা তৈরি করা যেত না? সংসদে সংখ্যার বিচারে পিছিয়ে থাকলেও বিরোধীরা কি সম্মিলিতভাবে জনমত গঠনের আরও কার্যকর চেষ্টা করতে পারতেন না?
এসব প্রশ্নের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কাজ কেবল ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করা নয়; সরকারের সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব চিহ্নিত করে বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরাও তাদের দায়িত্ব। কোনও আইন প্রণয়নের সময় কার্যকর ভূমিকা না নিয়ে পরে শুধু প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকলে সেই প্রতিবাদের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
তবে দেরিতে প্রতিবাদ শুরু হওয়া মানেই সেই প্রতিবাদ অযৌক্তিক, এমন নয়। কোনও আইনের প্রয়োগে নতুন সমস্যা সামনে এলে বা তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে নতুন তথ্য প্রকাশিত হলে পরবর্তী সময়েও আপত্তি তোলা যেতে পারে। আসল প্রশ্ন হলো, প্রতিবাদ কি সুস্পষ্ট দাবি, তথ্যপ্রমাণ এবং সাংবিধানিক যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, নাকি তা কেবল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগে তৈরি হওয়া সাময়িক প্রচার?
বিরোধী দলগুলির কাছে এখন তাই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা, অন্যদিকে অতীতের রাজনৈতিক অনৈক্য ও কৌশলগত দুর্বলতার আত্মসমালোচনা করা। শুধু প্রধানমন্ত্রী পদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করে গণতন্ত্র রক্ষার দাবি বিশ্বাসযোগ্য করা কঠিন।
গণতন্ত্র কি কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই?
ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন মানে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়। নির্বাচন হলো নাগরিকের মতপ্রকাশ, ক্ষমতার বৈধতা নির্ধারণ এবং সরকারের ওপর জননিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সেই প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তাই কমিশনের নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং আইনি সুরক্ষা নিয়ে বিতর্ককে নিছক বিজেপি বনাম কংগ্রেস, কিংবা মোদী বনাম রাহুলের লড়াই হিসেবে দেখলে মূল বিষয়টি আড়ালে থেকে যাবে।
সরকারের যুক্তি শোনা যেমন জরুরি, তেমনই বিরোধীদের আপত্তিও গুরুত্ব দিয়ে বিচার করা দরকার। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আইন পাশ করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ; কিন্তু সেই সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যবহার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা ও জনআস্থাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, সেটিও জনপরিসরে আলোচনার বিষয়।
একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রে সরকারকে প্রশ্ন করার মতো কার্যকর বিরোধী দল থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে রাখার জন্য গ্রহণযোগ্য নিয়োগপ্রক্রিয়া ও স্বচ্ছ জবাবদিহি থাকা দরকার। এই দুইয়ের কোনও একটিতে ঘাটতি তৈরি হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা দুর্বল হতে পারে।
২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন সেই বৃহত্তর বিতর্কেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই আইন নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি, সরকারের যুক্তি এবং আইনি পর্যালোচনা, সবকিছুর নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হওয়া দরকার। বিরোধীদের রাজনৈতিক দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেমন যুক্তিসঙ্গত, তেমনই সরকারের সিদ্ধান্তের প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলাও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ।
বিরোধীদের ঘুম ভাঙলেই কি সমস্যার সমাধান?
২০২৩ সালের ঘটনাপ্রবাহ আজও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে রাখছে—বিরোধী দলগুলি কি ক্ষমতাসীন সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর বিকল্প গড়ে তোলার চেয়ে নিজেদের নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় বেশি সময় ব্যয় করেছিল? নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন নিয়ে বিতর্ক কি বিরোধী ঐক্যের সীমাবদ্ধতা এবং সাংবিধানিক প্রশ্নে রাজনৈতিক প্রস্তুতির ঘাটতিকে সামনে এনেছে?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর একমাত্র রাজনৈতিক স্লোগানে পাওয়া যাবে না। সংসদীয় নথি, আইনের বিধান, আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট দলগুলির কার্যকলাপের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করতে হবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, গণতন্ত্র রক্ষার প্রশ্নকে কেবল নির্বাচনী প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে চলবে না। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি ধারাবাহিক ও নীতিনিষ্ঠ হওয়া প্রয়োজন।
বিরোধীদের জন্যও শিক্ষা রয়েছে। নিজেদের মধ্যে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, কোন দল কত আসন পাবে কিংবা কে জাতীয় নেতৃত্বের মুখ হবেন, এসব রাজনৈতিক প্রশ্নের গুরুত্ব থাকলেও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতার প্রশ্ন তার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তুলতে হলে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঊর্ধ্বে উঠে অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি ও সুস্পষ্ট গণতান্ত্রিক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।
অন্যদিকে, সরকারের কাছেও প্রত্যাশা থাকবে, নির্বাচনী ব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে শুধু আইনি বৈধতা নয়, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও জনআস্থাও সুরক্ষিত থাকে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি কোনও একক নেতা, দল বা সরকারের নয়। প্রশ্নটি ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে তার জবাব হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, যুক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে। আর বিরোধীরা যদি সত্যিই গণতন্ত্র রক্ষার লড়াইয়ে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে চান, তবে তাঁদেরও প্রমাণ করতে হবে, ক্ষমতার স্বপ্নের চেয়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তাঁদের কাছে বড়।
২০২৩ সালের আইন সেই কারণেই শুধু একটি আইন প্রণয়নের ঘটনা নয়; এটি সরকার, বিরোধী দল এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার বিষয়। সেই আলোচনায় রাজনৈতিক কটাক্ষ থাকতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত বিচার হতে হবে তথ্য, আইন এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ভিত্তিতে।




