বিশ্ব খাদ্যসংকটে উপমহাদেশের শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় স্থান পেল পাকিস্তান ও বাংলাদেশ

বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা ‘অ্যাকশন এগেনস্ট হাঙ্গার’ এর ২০২৬ সালের এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ভয়ঙ্কর চিত্র। বিশ্বের যে ১০টি দেশে ক্ষুধার সংকট সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত, সেই তালিকাতেই ঠাঁই করে নিয়েছে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর তীরের এই দুই দেশ।

আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ সালে কেবল পাকিস্তানেই প্রায় ১ কোটি ৬ লক্ষ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তার প্রয়োজন হতে চলেছে। প্রতিদিনের দু’বেলা ডাল-ভাতের জোগাড় করাই এখন এই দুই দেশের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে এক অলৌকিক যুদ্ধের শামিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে এক মারাত্মক বৈপরীত্যের কথা তুলে ধরা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা বিশ্বব্যাংকের শর্ত মেনে পাকিস্তান সরকার যখন তথাকথিত ‘অর্থনৈতিক সংস্কারে’র জয়ঢাক পেটাচ্ছে, ঠিক তখনই তলানিতে গিয়ে ঠেকছে দেশের আমজনতার জীবনযাত্রার মান। সামষ্টিক অর্থনীতি বা খাতা-কলমে জিডিপির কিছু সূচকে সামান্য স্বস্তি দেখা গেলেও, তার সুফল সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির কাছে পৌঁছানো তো দূরের কথা, উল্টে তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে।

লাগামহীন জিনিসপত্রের দাম আর কাজ হারানোর হাহাকারে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সঞ্চয় শূন্যে এসে ঠেকেছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা ও খরার কবলে পড়েছে কৃষি। বাজারদরের চরম বৈষম্যের কারণে কৃষক ও কৃষি-শ্রমিকরা আজ স্বাবলম্বী হওয়ার বদলে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। ‘অ্যাকশন এগেনস্ট হাঙ্গার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র ১০টি দেশে প্রায় ১৭ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ চরম খাদ্যাভাব ও অনাহারের মুখোমুখি।

বিগত এক দশকে বিশ্বজুড়ে গুরুতর ক্ষুধার সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের ১০টি সর্বাধিক খাদ্যসংকটগ্রস্ত দেশ নাইজেরিয়া, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, সুদান, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, মায়ানমার, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, বিশ্বের মোট ৪৭টি দেশের প্রায় ২৬ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ বর্তমানে মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

সংকট যখন দ্বিগুণ হচ্ছে, তখন আন্তর্জাতিক মানবিক ত্রাণের সংস্থান মারাত্মকভাবে কমে এসেছে। পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তার অভাবে দুই দেশের প্রান্তিক পরিবারগুলো বেঁচে থাকার তাগিদে মারাত্মক সব পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে, অধিকাংশ পরিবার পুষ্টিকর খাদ্য বাদ দিয়ে দিনে একবেলা খেয়ে বা খাবারের পরিমাণ অর্ধেক করে দিন গুজরান করছে। জীবিকা বাঁচাতে সহায়-সম্বল ও গবাদি পশু বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।

চরম অর্থনৈতিক চাপে হাজার হাজার শিশুর পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়ে তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে শিশুশ্রমের দিকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিশুদের ওপর। বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে পাকিস্তান ও বাংলাদেশে মারাত্মক আকারের অপুষ্টি, শিশুর মানসিক বিকাশ রোধ এবং অকালমৃত্যুর হার জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে।

অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা, দুর্বল প্রশাসনিক নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মাশুল শেষ পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে সেই আমজনতাকেই। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের এই খাদ্যাভাব কেবল এই দুই দেশের ভেতরের সমস্যা নয়, বরং এটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার সামাজিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এক বিশাল বড় লাল সংকেত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আঞ্চলিক নেতৃত্ব এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, আগামী দিনে অনাহার ও পুষ্টিহীনতার এই করাল গ্রাস থেকে মুক্তির কোনো পথ খোলা থাকবে না।

Related Posts

পুজোর আনন্দ মুহূর্তে পরিণত হল মৃত্যুমিছিলে! চোরবাগানে পদপিষ্ট হয়ে ১৭ জনের মৃত্যুর খবর

বৃষ্টির মধ্যে মণ্ডপে উপচে পড়া ভিড়, পিছন থেকে ধাক্কা, তার পরই হুড়োহুড়ি! বহু আহতের অবস্থা সংকটজনক, মৃতের সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ পুজোর আনন্দ, আলোর ঝলকানি আর…

২০২৩ সালেই কি শুরু হয়েছিল ‘নির্বাচনী নিয়ন্ত্রণের’ আসল খেলা?

বিরোধীদের ঘুম ভাঙতে দেরি, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন ঘিরে প্রশ্নের মুখে গণতন্ত্রের নিরপেক্ষতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ ভারতের গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন কেবল একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং অবাধ ও…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *