বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক, ৮ জুলাইঃ ফুটবলকে কেন ‘অনিশ্চয়তার খেলা’ বলা হয়, তার আরেকটি নাটকীয় উদাহরণ দেখা গেল মঙ্গলবারের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে। একসময় দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও অবিশ্বাস্য মানসিক দৃঢ়তা, অদম্য লড়াই এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাল না ছাড়ার মানসিকতার জোরে ম্যাচে ফিরে এসে কোয়ার্টার ফাইনালে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করল আর্জেন্টিনা। শুরুতে হতাশা, মাঝপথে দুশ্চিন্তা আর শেষ পর্যন্ত উচ্ছ্বাস, সব আবেগেরই যেন এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ছিল এই ম্যাচে।
খেলার শুরু থেকেই মিশর ছিল আত্মবিশ্বাসী। বলের দখল, দ্রুত প্রতি-আক্রমণ এবং আক্রমণভাগের কার্যকর সমন্বয়ে তারা আর্জেন্টিনার রক্ষণকে একাধিকবার চাপে ফেলে। অন্যদিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের খেলায় শুরু থেকেই দেখা যায় অস্বস্তি। মাঝমাঠে ছন্দের অভাব, আক্রমণে সমন্বয়হীনতা এবং সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে প্রথমার্ধেই চাপে পড়ে যায় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত আসে যখন এক গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা। সমর্থকদের আশা ছিল অধিনায়ক লিওনেল মেসির পা থেকেই ফিরবে সমতা। কিন্তু সেদিন ভাগ্য যেন তাঁর পাশে ছিল না। তাঁর নেওয়া শট সহজেই প্রতিহত করেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের। স্টেডিয়ামজুড়ে তখন নেমে আসে হতাশার ছায়া। আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মুখে উদ্বেগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শুধু পেনাল্টিই নয়, পুরো প্রথমার্ধে মেসিকে বারবার প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের চাপে পড়তে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি আক্রমণভাগের সতীর্থরাও। আলভারেজ, এনজো ফার্নান্দেজসহ একাধিক খেলোয়াড় সুযোগ তৈরি করলেও শেষ মুহূর্তে তা সফলতায় রূপ দিতে ব্যর্থ হন। এর বড় কারণ ছিলেন মিশরের গোলরক্ষক মোস্তফা শোবের। একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে তিনি আর্জেন্টিনার আক্রমণকে কার্যত ব্যর্থ করে দেন। তাঁর দৃঢ়তা মিশরকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এগিয়ে রাখে এবং ম্যাচের অন্যতম নায়কে পরিণত করে।
অন্যদিকে মিশরের আক্রমণের প্রাণকেন্দ্র ছিলেন মহম্মদ সালাহ। নিজের স্বভাবসুলভ গতি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং নিখুঁত পাসে তিনি বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষণকে ভেঙে দেন। তাঁর তৈরি করা আক্রমণ থেকেই ম্যাচের ১৫ মিনিটে ইব্রাহিমের দুর্দান্ত হেডারে প্রথম গোল আসে। গোলটি শুধু মিশরকে এগিয়ে দেয়নি, বরং আর্জেন্টিনার ওপর বাড়তি মানসিক চাপও তৈরি করে।
দ্বিতীয়ার্ধেও মিশরের আত্মবিশ্বাসে কোনও ভাটা পড়েনি। ৬৭ মিনিটে মোস্তাফার গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ২-০। স্টেডিয়ামের একাংশ তখন উৎসবে মেতে উঠলেও আর্জেন্টিনার সমর্থকদের মুখে স্পষ্ট হতাশা। এরই মধ্যে রেফারির এক বিতর্কিত সিদ্ধান্তে মিশরের আরও একটি গোল বাতিল হওয়ায় ম্যাচে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। সেই গোলটি স্বীকৃতি পেলে ব্যবধান আরও বেড়ে যেতে পারত বলেই মনে করছিলেন অনেকেই।
কিন্তু ফুটবল এমনই এক খেলা, যেখানে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনও ফলাফল নিশ্চিত বলা যায় না। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করেনি। বরং ধীরে ধীরে নিজেদের পরিচিত ছন্দে ফিরে আসে। মাঝমাঠে বলের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়, আক্রমণের গতি তীব্র করে এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে লাগাতার চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে।
ম্যাচের শেষ পর্বে সেই চাপই ফল দিতে শুরু করে। একের পর এক আক্রমণে মিশরের রক্ষণভাগ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। নির্ধারিত সময়ের শেষদিকে ব্যবধান কমিয়ে ম্যাচে ফেরে আর্জেন্টিনা। এরপর সংযুক্ত সময়ে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত আরেকটি গোল। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় ম্যাচের চিত্র। যে দল কিছুক্ষণ আগেও বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে।
এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন শুধু একটি জয় নয়, বরং দলগত মানসিক দৃঢ়তা, বিশ্বাস এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শুরুতে হতাশাজনক পারফরম্যান্স থাকলেও কঠিন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাই বড় দলের আসল পরিচয় এই ম্যাচ যেন সেই কথাই আবারও মনে করিয়ে দিল।
অন্যদিকে, পরাজিত হলেও মিশরের লড়াকু ফুটবল, শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণ এবং গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেরের অসাধারণ পারফরম্যান্স দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে। একইভাবে মহম্মদ সালাহর নেতৃত্বে দল যে সাহসী ফুটবল উপহার দিয়েছে, তা প্রতিপক্ষকেও যথেষ্ট চাপে ফেলেছিল।
ফুটবল ইতিহাসে এমন অনেক ম্যাচ রয়েছে, যা শুধু ফলাফলের জন্য নয়, নাটকীয়তা, আবেগ এবং অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকে। আপনার বর্ণিত এই লড়াইটিও তেমনই এক রুদ্ধশ্বাস গল্প যেখানে হতাশা থেকে আশা, আর আশা থেকে বিজয়ের পথ রচিত হয়েছে শেষ মুহূর্তের লড়াইয়ে।





