বিকশিত ভারতের স্বপ্নে ঘোর অনিশ্চয়তা ও নৈরাশ্যের আঁধারে তলিয়ে যাচ্ছে  তরুণদের ভবিষ্যৎ

নীতি আয়োগের প্রকাশিত ‘রিইম্যাজিনিং স্কিলিং ফর বিকশিত ভারত@২০৪৭’ শীর্ষক বিস্ফোরক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক আতঙ্কজনক পরিসংখ্যান ভারতের ৩৭ কোটি জেন জি জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৮ কোটি ৭০ লক্ষ তরুণ-তরুণী বর্তমানে এনইইটিঅবস্থায় রয়েছে।

এনইইটি এর পূর্ণ রূপ হলো ‘নট ইন এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট, অর ট্রেনিং’ অর্থাৎ, এরা না কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে, না কোনো কাজ করছে, আর না কোনো কর্মসংস্থানের উপযোগী প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনসংখ্যার বোনাসকে হাতিয়ার করে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা একটি দেশের জন্য এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়, বরং এক সুগভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের আগাম ঘণ্টার ধ্বনি।

নীতি আয়োগের রিপোর্ট এবং দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এই অভূতপূর্ব সংকটের নেপথ্যে একাধিক কাঠামোগত কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, নিট তালিকায় থাকা তরুণ-তরুণীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। রক্ষণশীল পারিবারিক মানসিকতা ও অনাসৃষ্টিমূলক পারিবারিক কাজের চাপে এই বিশাল সংখ্যার তরুণী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে।

নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির জন্য উচ্চশিক্ষার খরচ আজ এক বিশাল বোঝা। টিউশন ফি, বইপত্র, যাতায়াত এবং পেশাগত স্কিল কোর্সের আকাশছোঁয়া খরচের কারণে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ বাধ্য হয়ে মাঝপথেই পড়াশোনা বা প্রশিক্ষণ ছেড়ে দিচ্ছে।

প্রতি বছর আনুমানিক ১ কোটি নবীন চাকরিপ্রার্থী কাজের বাজারে নামছেন। কিন্তু প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার অহেতুক বিলম্ব এবং সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে চলা একের পর এক প্রশ্ন ফাঁস ও নিয়োগ দুর্নীতির ঘটনা তরুণদের মনোবল ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। বেসরকারি ক্ষেত্রের অবস্থা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। গত ৩ থেকে ৪ বছরে দেশের প্রথম সারির তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলিতে ফ্রেশার নিয়োগ প্রায় ৮০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

উপরন্তু, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের দ্রুত প্রসারে শুরুর দিকের সাধারণ চাকরিগুলি দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। স্কুল-কলেজের পাঠ্যক্রমের সাথে বাস্তব কাজের বাজারের চাহিদার আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে। সমীক্ষা বলছে, মাত্র ৮ শতাংশ স্নাতক তাদের পঠিত বিষয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক চাকরি খুঁজে পান। অর্থাৎ দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বিপুল পরিমাণ ডিগ্রিধারী তৈরি করলেও কর্মক্ষম পেশাদার তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশই হলো এই জেন জি। এত বিপুল এক তরুণ জনসংখ্যা যেখানে দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে সাড়ে আট কোটিরও বেশি কর্মহীন ও প্রশিক্ষণে পিছিয়ে থাকা তরুণ সমাজের ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিচ্ছে। অভিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এই সংকট কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

দীর্ঘদিনের বেকারত্ব ও অনিশ্চয়তা এই জেন জি প্রজন্মের মধ্যে গভীর মানসিক হতাশা, অপরাধপ্রবণতা এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। যদি একটি দেশ তার তরুণ শক্তির প্রায় এক-চতুর্থাংশকে কোনো উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করতে না পারে, তবে সেই দেশ কীভাবে ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত বা বিকশিত ভারত এর স্বপ্নপূরণ করবে?

এই জটিল পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারকে কেবল নতুন চাকরির বিজ্ঞাপন দিলেই চলবে না, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যবর্তী এই দুস্তর ব্যবধান দূর করতে হবে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে, পাঠ্যক্রমকে সনাতন ধারার গণ্ডি থেকে বের করে বর্তমান বাজারের উপযোগী, বিশেষ করে এআই, ডেটা সায়েন্স ও অটোমেশনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের তরুণদের জন্য সম্পূর্ণ নিখরচায় বা নামমাত্র খরচে মানসম্পন্ন প্রযুক্তিগত ও পেশাদার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা ফিরিয়ে এনে তরুণ সমাজের খোয়া যাওয়া ট্রাস্ট বা বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা জরুরি। পারিবারিক ও সামাজিক বিধিনিষেধ ভেঙে নারীদের শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ সামাজিক সচেতনতা ও সরকারি উৎসাহ ভাতা প্রদান জরুরি।

আজ ভারতের সামনে প্রশ্নটা অত্যন্ত পরিষ্কার, আমরা কি আমাদের এই ৩৭ কোটির তরুণ শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হব, নাকি নীতিগত ব্যর্থতার কারণে ৮ কোটি ৭০ লক্ষ নিট তরুণ-তরুণীকে বেকারত্বের অন্ধকারে ঠেলে দিয়ে এক সামাজিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে? সিদ্ধান্ত ও দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই।

  • Related Posts

    শিলচর পুরনিগম নির্বাচন: ডিগ্রিতে জালিয়াতি করলেই কপালে শনি, জাল সার্টিফিকেট জমা দিলেই শ্রীঘরে যাওয়ার রাস্তা পাকা!

    ভুঁইফোড় বোর্ডের সার্টিফিকেট দিয়ে আর পার পাওয়া যাবে না, মেধা ও সততার অগ্নিপরীক্ষায় নামতে হচ্ছে প্রার্থীদের, শিলচর পুরনিগম নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের কড়া হুঁশিয়ারি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার…

    শিলচরে ব্যবসার নামে লোভনীয় লভ্যাংশের ফাঁদ পেতে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ, শিলচরের বেরেঙ্গার সাদ্দামের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।

    গ্রেপ্তারির পর জামিনে বেরিয়ে সামাজিক বিচারসভার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ; ২৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই উধাও প্রতারক। বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র শিলচরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *