বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৭ অক্টোবরঃ উৎসবের আলোয় যখন চারপাশ সেজে ওঠার কথা, ঠিক তখনই বরাক উপত্যকার গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত পাকা সুপারির বাজারে নেমে এসেছে দুর্দিন। শারদোৎসবের ঠিক প্রাক্কালে কৃষকদের মুখে হাসি ফোটার বদলে দেখা দিয়েছে গভীর উৎকণ্ঠা ও হতাশা। অভিযোগের আঙুল উঠেছে এক শক্তিশালী ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে, যাদের কারসাজিতে জলের দরে পাকা সুপারি বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক চাষিরা। পুজোর মরশুমে নতুন জামাকাপড় বা উৎসবের প্রস্তুতি তো দূরের কথা, সারাবছর তিল তিল করে ফলানো ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে এখন চোখে সর্ষেফুল দেখছেন শিলচর, হাইলাকান্দি ও শ্রীভুমি জেলার লক্ষাধিক সুপারি চাষি।
বরাক উপত্যকার গ্রামীণ অর্থনীতি মূলত ধান ও সুপারি এই দুই প্রধান কৃষি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া সুপারি চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় প্রায় প্রতিটি গ্রামীণ পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সুপারি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু চলতি মৌসুমে পাকা সুপারির ফলন ভালো হলেও কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে অপ্রত্যাশিত দাম পতন।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, খোলা বাজারে বা পাইকারি বাজারে ক্রেতা সাধারণের নাগালের বাইরে পণ্যের দাম চড়া থাকলেও, বাগান থেকে যখন সুপারি তোলা হচ্ছে, তখন চাষিদের হাতে নামমাত্র মূল্য তুলে দেওয়া হচ্ছে। অনেক এলাকায় নামমাত্র দরে সুপারি বিক্রি করতে হচ্ছে, যা দিয়ে চাষের খরচ বা সার-জলের জোগানটুকুও উঠছে না। পুজোর মুখে ঘরে ঘরে যখন উৎসবের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, তখন মহাজনের ঋণ শোধ আর পরিবারের দুবেলা অন্নসংস্থান করতে গিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
গ্রামাঞ্চলের ক্ষুব্ধ চাষি ও সচেতন মহলের জোরালো অভিযোগ, এই অস্বাভাবিক মূল্য পতনের পেছনে রয়েছে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট চক্র। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। বাগান থেকে পাকা সুপারি নামার মরশুম শুরু হতেই এই সিন্ডিকেট ইচ্ছাকৃতভাবে দাম কমিয়ে দেওয়ার সিন্ধান্ত নেয়। চাষিদের কোনো বিকল্প বা দরকষাকষির সুযোগ না দিয়ে সিন্ডিকেটের নির্ধারিত কম দামেই ফসল বেচতে বাধ্য করা হচ্ছে।
বরাক উপত্যকায় সরকারি স্তরে পাকা সুপারি সংরক্ষণের পর্যাপ্ত পরিকাঠামো বা কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় কৃষকরা বাধ্য হন কম দামে কাঁচা ফসল বিক্রি করে দিতে। কারণ পাকা সুপারি বেশি দিন ফেলে রাখা যায় না, নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। এই অসহায়তার সুযোগই পুরোপুরি সদ্ব্যবহার করছে সিন্ডিকেট চক্র। চাষিরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলান, অথচ মুনাফার পুরোটাই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী এবং সিন্ডিকেটের পকেটে।
বরাকের বিভিন্ন গ্রামীণ বাজার এবং হাটগুলোতে এখন চাষিদের দীর্ঘশ্বাস আর ক্ষোভের আগুন স্পষ্ট। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রতি বছর পুজোর আগে এই চক্রটি আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। এক প্রবীণ সুপারি চাষি আক্ষেপের সুরে বলেন, “সারাবছর দিনরাত এক করে সুপারি বাগান পরিচর্যা করেছি। ভেবেছিলাম এই দুর্গাপুজোয় ছেলেমেয়েদের মুখে হাসি ফোটাতে পারব, কিছু টাকা হাতে আসবে। কিন্তু এই সিন্ডিকেটের কারসাজিতে আজ আমাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। সরকার ও প্রশাসন যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে বরাকের গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, এভাবে যদি পাকা সুপারির মতো একটি প্রধান উৎপাদিত পণ্যের বাজার সিন্ডিকেটের কারণে ধসে পড়তে থাকে, তবে তা গোটা অঞ্চলের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অবিলম্বে সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে সুপারি ক্রয় করার ব্যবস্থা করা, কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন এবং সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, উৎসবের এই আনন্দঘন দিনগুলোতে বরাকের গ্রামীণ জনপদে উৎসবের আলোর বদলে নেমে আসবে চরম অর্থনৈতিক অন্ধকার। প্রশাসনিক কর্তারা এই জনরোষ ও গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে কবে ঘুম ভাঙাবেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।





