পরিকাঠামো ছাড়া নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া চলবে না, তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স পুনর্বহালের দাবি, উপাচার্যের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১ জুলাইঃ পর্যাপ্ত পরিকাঠামো, শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় একাডেমিক প্রস্তুতি ছাড়াই আসামের বিভিন্ন কলেজে চার বছর মেয়াদি স্নাতক ডিগ্রি কোর্স চালুর ফলে যে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার অবিলম্বে সমাধানের দাবিতে মঙ্গলবার ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে স্মারকপত্র প্রদান করল অল ইন্ডিয়া ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (এআইডিএসও)-এর আসাম রাজ্য কাউন্সিল।
সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বর্তমান বাস্তবতায় এই নীতি বহু শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার পথে নতুন অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করছে এবং তা পুনর্বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। এআইডিএসও-র আসাম রাজ্য কাউন্সিলের সভাপতি হিল্লোল ভট্টাচার্য-এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দীর্ঘ আলোচনা করে। প্রতিনিধিদল একটি বিস্তারিত স্মারকপত্র জমা দিয়ে চারটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরে।
সংগঠনের প্রথম দাবি, তিন বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্সে নির্দিষ্ট বিষয়ে মেজর নিয়ে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেটে স্পষ্টভাবে মেজরসহ উত্তীর্ণ উল্লেখ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তিন বছরের স্নাতক কোর্স সম্পন্নকারী সমস্ত শিক্ষার্থীর জন্য স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পর্যাপ্ত আসনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে কেউ বঞ্চিত না হন। তৃতীয় দাবিতে এআইডিএসও জানায়, দেশের একাধিক রাজ্যে এখনও তিন বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্স চালু রয়েছে।
আসামেও অধিকাংশ কলেজে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার ও অন্যান্য একাডেমিক পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে। তাই আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পূর্বের মতো তিন বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্স পুনরায় চালু করা উচিত। চতুর্থ দাবিতে সংগঠন প্রস্তাব দেয়, রাজ্যের শিক্ষাবিদ, শিক্ষক সংগঠন ও ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে চার বছর মেয়াদি ডিগ্রি কোর্সকে বাধ্যতামূলক না করে ঐচ্ছিক হিসেবে চালু করা হোক। শুধুমাত্র যেসব শিক্ষার্থী আগ্রহী, তাঁদেরই এই কোর্সে ভর্তির সুযোগ দেওয়া উচিত বলে তারা মত প্রকাশ করে।
স্মারকপত্র গ্রহণের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠকের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ। আলোচনায় উপাচার্য জানান, তিন বছর মেয়াদি স্নাতক কোর্সে মেজর নিয়ে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেটে মেজর উল্লেখ করার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যেই নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানায় ছাত্র সংগঠন।
তবে শিক্ষক সংকটের প্রসঙ্গে উপাচার্য স্পষ্ট করেন যে, শিক্ষক নিয়োগ বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন নয়; এটি সম্পূর্ণরূপে রাজ্য সরকারের বিষয়। এর জবাবে এআইডিএসও প্রতিনিধিরা বলেন, পর্যাপ্ত শিক্ষক ছাড়া চার বছর মেয়াদি নতুন পাঠক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। শুধুমাত্র নতুন কারিকুলাম তৈরি করলেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় না; তার জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার ও একাডেমিক অবকাঠামো।
উপাচার্য জানান, সমস্যার আংশিক সমাধানের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছে। প্রয়োজনে পাশাপাশি অবস্থিত কলেজগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থাও করা হতে পারে। কিন্তু এই প্রস্তাবকে অস্থায়ী সমাধান বলে উল্লেখ করে ছাত্র প্রতিনিধিরা প্রশ্ন তোলেন এক কলেজের শিক্ষার্থীকে অন্য কলেজে পাঠিয়ে নিয়মিত পাঠদান কতটা বাস্তবসম্মত এবং শিক্ষার্থীদের পক্ষে কতটা সুবিধাজনক হবে? বৈঠকে এআইডিএসও আরও অভিযোগ করে, চার বছর মেয়াদি ডিগ্রি কোর্স চালুর নেপথ্যে উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণের প্রবণতা কাজ করছে।
সংগঠনের দাবি, রাজ্যে ইতিমধ্যে বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ক্ষেত্রে আইন শিথিল করে বৃহৎ পুঁজিপতিদের শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি কলেজগুলোতে যখন শিক্ষক ও পরিকাঠামোর ঘাটতি প্রকট, তখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থের বিনিময়ে চার বছর মেয়াদি কোর্স পরিচালনার সুযোগ পাবে। এর ফলে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।
ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা আরও বলেন, একদিকে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বলছে, অন্যদিকে নতুন শিক্ষানীতির সফল বাস্তবায়নের জন্য যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষক ও অবকাঠামো প্রয়োজন, তার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনও দেখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় পরিকাঠামোহীন কলেজগুলোতে চার বছর মেয়াদি ডিগ্রি কোর্স কার্যকর করা বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এআইডিএসও-র পক্ষ থেকে রাজ্য সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে ছাত্রস্বার্থ ও শিক্ষার মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নীতিগত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়। সংগঠন জানায়, শিক্ষার্থীদের মতামত, শিক্ষকদের অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করলে আগামী দিনে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে আরও জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। এদিনের প্রতিনিধি দলে এআইডিএসও-র আসাম রাজ্য কাউন্সিলের যুগ্ম সম্পাদক বিপ্লব রিসং, মাধুর্য গগৈ, জুন মণি মিরি, ভাইটি সুংক্রাং-সহ অন্যান্য ছাত্রনেতারা উপস্থিত ছিলেন।






