কুড়ি বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান পুজোর আগেই যাতায়াতের দীর্ঘ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছে বরাক উপত্যকা

দীর্ঘ প্রতীক্ষার সেই অবসান ঘটিয়ে মহোৎসবের আমেজেই অর্থাৎ শারদীয় দুর্গাপুজোর প্রাক্কালেই পুরোপুরি চালু হতে চলেছে শিলচর–সৌরাষ্ট্র ইস্ট–ওয়েস্ট করিডরের সবচেয়ে জটিল ও চ্যালেঞ্জিং অংশ জাটিঙ্গা থেকে হারাঙ্গাজাও। জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষ (এনএইচএআই) এবং রাজ্য প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে এই মেগা প্রকল্পের কাজ এখন শেষ মুহূর্তের রূপ নিতে চলেছে।

২৭ নম্বর জাতীয় সড়কের প্রায় ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জাতিঙ্গা–হারাঙ্গাজাও অংশটি বহু বছর ধরে দেশের ইস্ট–ওয়েস্ট করিডরের সবচেয়ে বড় ব্লকেজ বা বাধা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির খামখেয়ালিপনা, দুর্বল এবং পলিময় মাটি আর সামান্য বৃষ্টিতেই ধেয়ে আসা প্রলয়ঙ্করী ভূমিধস এই অঞ্চলের নির্মাণকাজকে এক প্রকার অসম্ভব করে তুলেছিল।

প্রথাগত পদ্ধতিতে পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি করতে গেলেই তা বারবার ধসে পড়ছিল। এই অচলাবস্থা কাটাতে এনএইচএআই এক অত্যন্ত আধুনিক ও যুগান্তকারী প্রকৌশল কৌশল গ্রহণ করে। মাটির ওপর জোর করে রাস্তা না বানিয়ে, পাহাড়ের ঢাল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভূখণ্ড এড়িয়ে এই অংশে নির্মাণ করা হয়েছে মোট পাঁচটি সুদৃশ্য ও সুদীর্ঘ এলিভেটেড করিডর বা উড়ালপথ।

প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ‘দীনেশচন্দ্র আর আগরওয়ালা ইনফ্রাকন প্রাইভেট লিমিটেড-এর দিনরাত এক করা পরিশ্রমে বর্তমানে এই উড়ালপথগুলির কাজ একেবারে অন্তিম পর্যায়ে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি জাতিঙ্গা–হারাঙ্গাজাও অংশের নবনির্মিত এলিভেটেড করিডরের প্রায় এক কিলোমিটার অংশের দুটি লেন আনুষ্ঠানিকভাবে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে।

বাকি দুটি লেন আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার কঠোর লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে সংযোগকারী অ্যাপ্রোচ রোড তৈরি, উচ্চমানের ক্র্যাশ ব্যারিয়ার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন, বৃষ্টির জল নিষ্কাশনের জন্য পাকা নর্দমা এবং রোড ফার্নিচার বসানোর কাজ চলছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়।

এই রুদ্ধশ্বাস প্রকল্পের অগ্রগতি যে এতটা মসৃণভাবে এগোচ্ছে, তার নেপথ্যে রয়েছে অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রত্যক্ষ ও কঠোর নজরদারি। প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়, মুখ্যমন্ত্রীর বারবার উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং প্রকল্প রূপায়ণে অনমনীয় মনোভাবই বিগত কয়েক মাসে কাজকে কয়েকশো গুণ গতিশীল করে তুলেছে।

ভারতমালা পরিযোজনার অধীনে প্রায় ১,৬৭৪ কোটি টাকার বিশাল ব্যয়ে নৃরিমবাংলো থেকে জাতিঙ্গা জংশন–হারাঙ্গাজাও পর্যন্ত ৪৯.২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সামগ্রিক প্রকল্পের কাজ চলছে। মূল উদ্দেশ্য একটাই বরাক উপত্যকাকে ভারতের মূল ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামো নেটওয়ার্কের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত করা, যাতে ভৌগোলিক দূরত্ব আর কোনোভাবেই যোগাযোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে।

এই গুরুত্বপূর্ণ করিডরটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে ডিমা হাসাও ও বরাক উপত্যকার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব বিপ্লব আসবে। এতদিন ধরে বরাকবাসীর কাছে গুয়াহাটি বা দেশের অন্যান্য প্রান্তে যাতায়াত করা মানেই ছিল এক চরম শারীরিক ও মানসিক যাতনা। পাহাড়ি ভাঙা রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।

মাটির সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া এক প্রবীণ বাসচালকের অভিজ্ঞতা যেন এই পুরো যন্ত্রণার দলিল। তাঁর কথায়, গত ২০–২৫ বছর ধরে এই ভাঙাচোরা, বিপজ্জনক পাহাড়ি রাস্তায় জীবন বাজি রেখে গাড়ি চালিয়েছি। সামান্য বৃষ্টি হলেই কাদা ও পাথরের নিচে আটকে পড়তে হতো।

আগে গুয়াহাটি থেকে শিলচর পৌঁছাতে যেখানে প্রায় ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা সময় লাগত, সেখানে এই নতুন সড়ক ব্যবস্থা চালু হওয়ার ফলে এখন আমরা অনায়াসেই মাত্র ৩ ঘণ্টার মধ্যে যাত্রীদের নিরাপদে ও স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারব।

স্থানীয় সাধারণ মানুষও এই পরিবর্তনের ছোঁয়ায় দারুণ উচ্ছ্বসিত। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাওয়ার এই আনন্দ এখন প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে। তবে ওয়াকিবহাল মহলের আশা, দুর্গাপুজোর আগেই যদি সংযোগকারী বাকি অংশটুকুর কাজও সম্পূর্ণ হয়ে যায়, তবে পুজোর বাজারে বরাক উপত্যকার মানুষ এক অনন্যসাধারণ উপহার পাবে।

পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে তীব্র লড়াই আর দীর্ঘ দুই দশকের প্রতীক্ষার পর অবশেষে শিলচর–সৌরাষ্ট্র ইস্ট–ওয়েস্ট করিডরের এই অংশটি চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ মানচিত্রে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছুটে চলা এই আধুনিক হাইওয়ে এখন কেবল ইট-পাথরের রাস্তা নয়, বরং বরাকবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের এক জীবন্ত সরণি।

  • Related Posts

    শিলচর পুরনিগম নির্বাচন: ডিগ্রিতে জালিয়াতি করলেই কপালে শনি, জাল সার্টিফিকেট জমা দিলেই শ্রীঘরে যাওয়ার রাস্তা পাকা!

    ভুঁইফোড় বোর্ডের সার্টিফিকেট দিয়ে আর পার পাওয়া যাবে না, মেধা ও সততার অগ্নিপরীক্ষায় নামতে হচ্ছে প্রার্থীদের, শিলচর পুরনিগম নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের কড়া হুঁশিয়ারি বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার…

    শিলচরে ব্যবসার নামে লোভনীয় লভ্যাংশের ফাঁদ পেতে প্রায় ৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ, শিলচরের বেরেঙ্গার সাদ্দামের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।

    গ্রেপ্তারির পর জামিনে বেরিয়ে সামাজিক বিচারসভার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ; ২৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই উধাও প্রতারক। বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র শিলচরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *