ওভারলোড সিন্ডিকেটের তাণ্ডবে ৬ নং জাতীয় সড়ক মরণফাঁদে পরিণত!

বরং অনেকের কথায়, এ যেন রাস্তা নয়, ধানের জমি কিংবা মাছ চাষের পুকুর। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা কাদায় ডুবে যায়। কোথাও হাঁটুসমান জল, কোথাও বিশাল গর্ত। রোদ উঠলেই আবার ধুলোর ঝড়ে অন্ধকার হয়ে যায় চারপাশ। যানবাহন চলাচলের সময় এমন ধুলো উড়ছে যে দোকানের ভেতর পর্যন্ত ধুলো জমছে। ব্যবসায়ীরা মুখ খুলে বলছেন, এই অবস্থায় ক্রেতারা বাজারে আসতেই চান না। বিক্রি হবে কি না, তা যেন ভগবানই জানেন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। বছরের পর বছর ধরে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে, স্থানীয় মানুষ বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন, সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে স্থায়ী সমাধানের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। বরং অভিযোগ, যখন কোনো মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়ক বা ভিআইপি সফরে আসেন, তখন রাতারাতি রাস্তার উপরে সামান্য পাথর ফেলে বা কাদা ঢেকে মেকআপ করে দেওয়া হয়। হেলিপ্যাড থেকে সভাস্থল পর্যন্ত অস্থায়ী চকচকে রাস্তা তৈরি হয়, যাতে নেতাদের গাড়ির চাকা কাদায় না আটকে যায়।

কিন্তু সাধারণ মানুষ বছরের পর বছর প্রাণ হাতে নিয়ে যাতায়াত করলেও তাঁদের দুর্ভোগ যেন কারও চোখে পড়ে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাঁদের দাবি, বারবার রাস্তা মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। বর্ষার মধ্যেই কাজ করা হয়, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়, আর দুই-তিন মাসের মধ্যেই রাস্তা আগের অবস্থায় ফিরে যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এ কি শুধুই গাফিলতি, নাকি এর পেছনে রয়েছে বড়সড় দুর্নীতির সিন্ডিকেট?

এক প্রবীণ বাসিন্দা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, রাস্তা মেরামত এখন একটা ব্যবসা হয়ে গেছে। রাস্তা ভালো হয়ে গেলে তো আবার কাজের টেন্ডার হবে না। তাই ইচ্ছে করেই নিম্নমানের কাজ করা হয়। অন্যদিকে স্থানীয় ব্যবসায়ী মহলের বক্তব্য, রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে শুধু ব্যবসাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, যানজট ও ধুলোবালির কারণে প্রতিদিন মানুষের স্বাস্থ্যও বিপন্ন হচ্ছে। শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি ও চোখের সংক্রমণ বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বাজার এলাকায় দোকান খুলে বসা যেন একপ্রকার শাস্তির সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা আরও করুণ।

বৃষ্টির দিনে ইউনিফর্ম কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়। অনেকে পড়ে গিয়ে আহতও হচ্ছে। এক কলেজছাত্রী ক্ষোভের সঙ্গে জানায়, সরকার ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্মার্ট সিটি, উন্নয়নের কথা বলে। কিন্তু আমরা প্রতিদিন স্কুলে যেতে গিয়ে কাদার মধ্যে পড়ে যাই। এটা কি উন্নয়ন? যাত্রীবাহী গাড়ির চালকদের অভিযোগ, রাস্তার জন্য গাড়ির যন্ত্রাংশ দ্রুত নষ্ট হচ্ছে, জ্বালানি খরচ বাড়ছে এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে চলেছে। এক ট্রাক চালক বলেন, রাস্তার গর্ত বাঁচাতে গিয়ে কখনো ডানদিকে, কখনো বাঁদিকে গাড়ি নিতে হয়। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে ওভারলোডেড ট্রাক ও সিন্ডিকেট রাজ নিয়ে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাক নির্বিঘ্নে চলাচল করছে। নিয়ম ভেঙে অতিরিক্ত ওজন বহনকারী যানবাহনের কারণেই রাস্তার দ্রুত ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসনের তরফে কার্যকর নজরদারি বা কঠোর ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, কার স্বার্থে এই নীরবতা?

এই জাতীয় সড়ক শুধু কালাইন বা কাছাড় জেলার জন্য নয়, বরং সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লাইফলাইন। এই রাস্তা দিয়ে আসামের সঙ্গে মেঘালয়, মিজোরাম, ত্রিপুরা ও মণিপুরের যোগাযোগ রক্ষা হয়। প্রতিদিন অসংখ্য পণ্যবাহী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, যাত্রীবাহী বাস এবং ব্যক্তিগত যানবাহন এই সড়ক ব্যবহার করে। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়কের এই ভয়াবহ অবস্থা নিয়ে সরকার ও জন প্রতিনিধিদের নির্লিপ্ততা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি করেছে।

উল্লেখযোগ্যভাবে, আগে এই সড়কের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন । সেই সময় রাস্তার অবস্থা তুলনামূলক ভালো ছিল বলে অনেকেই দাবি করছেন। কিন্তু পরে কন্ট্রাক্টর নির্ভর ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর থেকেই রাস্তার মান দ্রুত অবনতি হতে শুরু করে বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের একাংশ সরাসরি অভিযোগ তুলছেন, কন্ট্রাক্টর রাজ এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় দুর্নীতির কারণেই আজ জাতীয় সড়কের এই করুণ পরিণতি। এখানেই শেষ নয়। শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে উন্নয়নের ঢাক বাজালেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের এই দুর্ভোগ নিয়ে তাঁদের নীরবতা এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভোটের সময় বড় বড় প্রতিশ্রুতি, উন্নয়নের বিজ্ঞাপন, কোটি কোটি টাকার প্রকল্প ঘোষণার পরও যদি জাতীয় সড়কের এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন উঠবেই, উন্নয়নের টাকা আসলে কোথায় যাচ্ছে? একইসঙ্গে বিরোধী দলগুলোকেও কাঠগড়ায় তুলছেন সাধারণ মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, বিরোধীরা মাঝে মাঝে সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিলেও বাস্তবে ধারাবাহিক আন্দোলন বা চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে তারা কার্যত ব্যর্থ। ফলে শাসক-বিরোধী উভয় পক্ষকেই এখন মানুষ নির্বাচনী রাজনীতির সুবিধাবাদী খেলোয়াড় বলেই কটাক্ষ করছেন।

দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারবার জ্বালানি সাশ্রয়, উন্নত অবকাঠামো এবং দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা বললেও কালাইন বাজারের বাস্তব চিত্র সেই বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। ভাঙা রাস্তার কারণে যানবাহনের অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে, সময় নষ্ট হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতিও বাড়ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ডাবল ইঞ্জিন সরকারের এত প্রচারের পরও যদি জাতীয় সড়কের এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ আর কাদের কাছে ন্যায়বিচার চাইবে?

সব মিলিয়ে কালাইন বাজারের জাতীয় সড়ক এখন শুধুমাত্র একটি ভাঙা রাস্তার সমস্যা নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা, রাজনৈতিক উদাসীনতা, দুর্নীতি, সিন্ডিকেট রাজ এবং জনদুর্ভোগের এক নির্মম প্রতীক হয়ে উঠেছে। এলাকাবাসীর একটাই দাবি, অস্থায়ী মেরামত নয়, দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থায়ী ও টেকসই সমাধান। অন্যথায় এই ক্ষোভ আগামী দিনে বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছে সচেতন মহল।

Related Posts

মাদকমুক্ত বরাকের স্বপ্ন কি অধরাই থেকে যাবে? শিলচরে প্রকাশ্যে মাদকসেবনের অভিযোগে চাঞ্চল্য, আতঙ্কে সাধারণ মানুষ

ফাটক বাজার, সদর থানা পর্যন্ত ছড়ানো নেশার রমরমা, পুলিশি অভিযানের পরও থামছে না প্রবণতা বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১০ জুনঃ বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার সদর শহর শিলচরে মাদকসেবনের অভিযোগ সংবলিত…

লক্ষীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের জয়পুর–হরিনগর সড়কের বেহাল দশায় ক্ষুব্ধ জনতা, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় প্রশ্নের মুখে উন্নয়নের দাবি

বর্ষায় জলমগ্ন আর গ্রীষ্মে ধুলোর ঝড়, বছরের পর বছর সংস্কারহীন সড়কে চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক শিলচর ১০ জুনঃ আধুনিক উন্নয়নের ঢক্কানিনাদ আর কাগুজে অগ্রগতির হিসাবের মাঝেই বাস্তবের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *