সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে উপমুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি; জরুরি পরিষেবা বাদে স্তব্ধ হতে চলেছে পাহাড়ি ও উপত্যকা অঞ্চল
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ অক্টোবরঃ পাহাড় ও উপত্যকার রক্তাক্ত সমীকরণে ফের কেঁপে উঠল উত্তর-পূর্বের সীমান্ত রাজ্য মণিপুর। ইম্ফল পূর্ব ও কাংপোকপি জেলার সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় কাঠ সংগ্রহ করতে যাওয়া তিন মেইতেই নাগরিককে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার জেরে এবার সরাসরি সরকারের সর্বোচ্চ শীর্ষ মহলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো। ৪ জন মেইতেই কাঠ সংগ্রাহকের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের দাবানলে জ্বলতে থাকা মণিপুরে সোমবার (১৯ অক্টোবর, ২০২৬) মধ্যরাত থেকে টানা ৪৮ ঘণ্টার রাজ্যব্যাপী সাধারণ বন্ধের ডাক দিয়েছে প্রভাবশালী সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন ‘নেটিভ পিপল কমিটি মণিপুর’ (এনপিসিএম)।
তবে কেবল হরতালেই সীমাবদ্ধ নেই এই প্রতিবাদ। সংগঠনটি সরাসরি তোপ দেগেছে উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপগেনের দিকে এবং তাঁর অবিলম্বে পদত্যাগের তীব্র দাবি তুলেছে। একই সাথে পাহাড়ি ও উপত্যকা অঞ্চলে অননুমোদিত সশস্ত্র উগ্রপন্থী শিবিরগুলি গুড়িয়ে দেওয়ার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে। জঙ্গল ও কৃষিজমিতে যাতায়াতকারী সাধারণ মানুষের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় রাজ্য ও কেন্দ্র, উভয় সরকারের চরম প্রশাসনিক নপুংসতার দিকেই আঙুল তুলছেন বিশ্লেষকরা।
খংবাল তাংখুল পাহাড়ে অমানবিক তাণ্ডব: নিহত ৪, শোকের ছায়া উপত্যকায়
ঘটনার সূত্রপাত উয়ুমপোক ও নোংশুম এলাকা থেকে। জীবিকার তাগিদে খংবাল তাংখুল পাহাড়ের পাদদেশবর্তী এলাকায় কাঠ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন স্থানীয় কয়েকজন গ্রামবাসী। অভিযোগ, সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা একদল সশস্ত্র উগ্রপন্থী তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে। এই বর্বরোচিত হামলায় ঘটনাস্থলেই তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয় এবং আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হন।

নিহতদের স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে এনপিসিএম নিহতদের পরিচয় জনসমক্ষে এনেছে, লইরেনপাকপাম ইনায়োবি মেইতেই (৪০), বাস: নোংশুম আরিবাম ননি মেইতেই (৩৫), বাস: নোংশুম, সুশীল সিং (৩০), বাস: উয়ুমপোক মামাং লেইকাই পেটের দায়ে বনে যাওয়া নিরীহ শ্রমিকদের এই পরিণতিতে পুরো উপত্যকাজুড়ে নেমে এসেছে শোক ও প্রতিবাদের তীব্র ঝড়।
উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপগেন ও কেএনএফ (পি)-এর দিকে অভিযোগের আঙুল
এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই মণিপুরের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এনপিসিএম স্পষ্ট অভিযোগ করেছে যে, রাজকীয় নিরাপত্তার আড়ালে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা চলছে। উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপগেনের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর মারাত্মক অভিযোগ এনেছে সংগঠনটি।
এনপিসিএম-এর দাবি, উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপগেনকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে, যাতে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা স্বজনপোষণ ও উগ্রপন্থীদের মদত দেওয়ার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা যায়। কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্ট-প্রোগ্রেসিভ বা কেএনএফ (পি)-এর চেয়ারম্যান এসএস থাংবোই কিপগেনের বিরুদ্ধে অবিলম্বে ফৌজদারি তদন্ত শুরু করে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।
সংগঠনটির অভিযোগ, সাইকুলের বিধায়কের আবেদনে কামজং জেলার পুলিশ সুপারকে বদলি করা এবং লেইলন ভাইফেই এলাকায় কেএনএফ (পি) সদস্যদের উদ্ধারে পরিচালিত অভিযানের নেপথ্যে উপমুখ্যমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ হাত ছিল। যদিও এই সমস্ত রাজনৈতিক অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে স্বাধীন সূত্রে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও প্রশাসনের নীরবতা জনমনে সন্দেহ আরও উস্কে দিচ্ছে।
সরকারের দরজায় এনপিসিএম-এর ৭ দফা সনদ ও বন্ধের রূপরেখা
রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর সর্বাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে এনপিসিএম কেন্দ্র ও রাজ্য প্রশাসনের কাছে ৭ দফা দাবি পেশ করেছে। যার মধ্যে প্রধান হলো, খংবাল তাংখুল পাহাড়ের পাদদেশ ও খামেনলক এলাকায় সক্রিয় থাকা অননুমোদিত উগ্রপন্থী ঘাঁটি ও আস্তানাগুলি অবিলম্বে চিহ্নিত করে খালি করা। কৃষিজমি ও পাহাড়ি সীমান্ত পথে সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় ইন্ডিয়া রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (আইআরবি)-সহ অতিরিক্ত আধা-সামরিক বাহিনী মোতায়েন। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলির সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘সাসপেনশন অব অপারেশনস’ চুক্তি অবিলম্বে বাতিল করার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান।
সংগঠনটি স্পষ্ট জানিয়েছে, সোমবার মধ্যরাত থেকে শুরু হওয়া ৪৮ ঘণ্টার বন্ধ পাহাড় ও উপত্যকা উভয় অঞ্চলেই কঠোরভাবে পালিত হবে। তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিষেবা, হাসপাতাল, অ্যাম্বুল্যান্স, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও জরুরি পরিষেবাকে এই বন্ধের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। মণিপুরের এই জটিল পরিস্থিতিতে যাতে নতুন করে জাতিগত দাঙ্গা ছড়িয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে নাগা ও মেইতেই যুবসমাজকে সম্প্রীতি ও ঐক্য বজায় রাখার আবেদন জানিয়েছে এনপিসিএম।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের পেটের দায়ে কাজ করতে গিয়ে এভাবে লাশ হয়ে ফেরা রাজ্য সরকারের সুরক্ষার বুলিকেই বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। একের পর এক হত্যাকাণ্ড, লাশ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও এবং উপমুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগের জোরালো দাবি প্রমাণ করছে যে, মনিপুরে প্রশাসনিক আস্থা এখন শূন্যের কোঠায়। সোমবার মধ্যরাত থেকে ডাকা এই ৪৮ ঘণ্টার বন্ধ মণিপুরের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার।





