প্রধানমন্ত্রী জন বিকাশ কার্যক্রমে টানা পাঁচ বছর কেন্দ্রীয় অর্থছাড় শূন্য, পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে থমকে উন্নয়ন
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে খোদ শাসক শিবিরের গলায় যে রাজ্যের নাম সবচেয়ে আগে উচ্চারিত হয়, সেই গুজরাটের অন্দরেই সংখ্যালঘু কল্যাণ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের ছবিটা যে কতটা কদর্য এবং হতাশাজনক, তার এক চাঞ্চল্যকর ও নগ্ন চিত্র উঠে এসেছে খোদ সংসদের ফ্লোরে।
রাজ্যসভায় পেশ করা কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রকের সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, প্রধানমন্ত্রী জন বিকাশ কার্যক্রম এর মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের অধীনে ২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ টানা এই পাঁচ অর্থবর্ষে গুজরাটের ঝুলিতে এসেছে একেবারে ‘শূন্য’ বা জিরো ফান্ড।
দেশের অন্যান্য রাজ্য যখন কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়ে পরিকাঠামো গড়ে তুলছে, তখন উন্নয়নের অহংকার দেখানো গুজরাটে কেন্দ্রীয় অর্থছাড়ের এই খরা কেবল প্রশাসনিক উদাসীনতা নয়, বরং এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অঞ্চলগুলিতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জল, স্যানিটেশন, মহিলাকেন্দ্রিক পরিকাঠামো এবং দক্ষতা উন্নয়নের মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলিকে চাঙ্গা করার জন্যই মূলত ‘প্রধানমন্ত্রী জন বিকাশ কার্যক্রম’ রূপায়ন করা হয়ে থাকে। অথচ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১-২২ থেকে শুরু করে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষ পর্যন্ত প্রতিটিতেই গুজরাটের অনুকূলে কেন্দ্রীয় অর্থছাড়ের অঙ্ক শূন্য। ২০২১-২২ সালের সরকারি নথিতে গুজরাটের পাশে লেখা হয়েছে ‘শূন্য’ কোটি টাকা। ঠিক একই কঙ্কালসার চিত্র বজায় ছিল পরবর্তী চার অর্থবর্ষ অর্থাৎ ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬-এও।
অথচ সমসাময়িককালে দেশের অন্যান্য রাজ্যগুলিতে টাকার ফোয়ারা ছুটেছে। অসমে ২০২১-২২ সালে ১৫৯.৯৯ কোটি, ২০২৪-২৫ সালে ১২৯ কোটি এবং ২০২৫-২৬ সালে এসেছে রেকর্ড ১৯৭.৫৬ কোটি টাকা। উত্তরপ্রদেশে ২০২৫-২৬ সালে এক ধাক্কায় ২৫০ কোটি টাকা অর্থছাড় হয়েছে।
পিছিয়ে নেই পশ্চিমবঙ্গও; ২০২১-২২ সালে ৩৮.৫৩ কোটি এবং ২০২৫-২৬ সালে ৪০.৩১ কোটি টাকা পেয়েছে এই রাজ্য। কর্ণাটক, মণিপুর, মিজোরাম, সিকিম কিংবা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলিও বিভিন্ন পর্যায়ে কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা নিজেদের ঝুলিতে ভরেছে। সেখানে গুজরাটের টানা পাঁচ বছরের শূন্য প্রাপ্তি মোটেও হালকাভাবে দেখার বিষয় নয়।
প্রকল্পের বাস্তবায়নের আসল চেহারাটা আরও স্পষ্ট হয় যখন বিগত বছরগুলিতে সম্পূর্ণ হওয়া প্রকল্পের পরিসংখ্যানের দিকে চোখ রাখা হয়। গোটা দেশে প্রধানমন্ত্রী জন বিকাশ কার্যক্রমের আওতায় প্রকল্পের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মোট ৮ লক্ষ ৫৯ হাজার ৯৭২টি প্রকল্প একক সফলভাবে সম্পূর্ণ হয়েছে।
এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে ৩ লক্ষ ৪৪ হাজার ৯৪৬টি, উত্তরপ্রদেশে ২ লক্ষ ১ হাজার ০৮৬টি এবং অসমে ১ লক্ষ ৯ হাজার ৭৯৮টি প্রকল্প রূপায়িত হয়েছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই দীর্ঘ সময়ে গুজরাটে সম্পূর্ণ হওয়া প্রকল্পের সংখ্যা মাত্র ৮২টি! জাতীয় মোটের নিরিখে যা মাত্র ০.০২ শতাংশেরও কম।
অবশ্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রক এই বৈষম্যের সাফাই দিতে গিয়ে জানিয়েছে যে, এই প্রকল্পটি কোনো নির্দিষ্ট রাজ্যভিত্তিক বরাদ্দের বা কোটার প্রকল্প নয়। রাজ্যগুলি থেকে যোগ্য প্রকল্পের প্রস্তাব জমা পড়া, নির্ধারিত শর্ত পূরণ এবং তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করার পরেই কেবল অর্থছাড় করা হয়।
কেন্দ্রের এই যুক্তি সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তাহলে কি বিগত পাঁচ বছরে গুজরাট সরকার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকার উন্নয়নের জন্য একটিও যোগ্য বা সঠিক প্রস্তাব কেন্দ্রের কাছে পাঠাতে পারেনি? নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে রাজ্যের একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে দূরে সরিয়ে রাখার কোনো সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক এজেন্ডা কাজ করছে? যদি প্রস্তাব না পাঠানো হয়ে থাকে, তবে তার দায় কার?
অন্যদিকে, জাতীয় স্তরে এই প্রকল্পের আর্থিক ব্যয়ের হিসাব ঘাঁটলে এক অদ্ভুত ও অপরিকল্পিত চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২১-২২ সালে এই প্রকল্পের প্রাথমিক বাজেট ১,৩৯০ কোটি টাকা থাকলেও প্রকৃত ব্যয় হয়েছিল ১,২৬৬.৩৬ কোটি টাকা। কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ সালে প্রাথমিক বাজেট ১,৬৫০০ কোটি থেকে কমিয়ে হঠাৎ ৫০০ কোটি করা হয় এবং প্রকৃত ব্যয় নেমে আসে মাত্র ১০৪.৫৮ কোটি টাকায়।
২০২৩-২৪ সালে ব্যয় ছিল ১৮৭.৮৮ কোটি টাকা, যা আবার ২০২৪-২৫ সালে লাফিয়ে ৯৫৫.২৩ কোটি এবং ২০২৫-২৬ সালে ১,৫৬৩.৮৭ কোটি টাকায় পৌঁছায়। বাজেটের এই লাগাতার ওঠানামা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের রূপায়ণে প্রশাসনিক পরিকল্পনার চরম দৈন্যকেই প্রকট করে তোলে।
কেন্দ্র দাবি করেছে যে, ভারতীয় লোকপ্রশাসন প্রতিষ্ঠান এবং নীতি আয়োগের মূল্যায়ন দপ্তরের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষের গুণমান যাচাইয়ে নিম্নমানের কাজের কোনো তথ্য সামনে আসেনি। তৈরি হওয়া পরিকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব খতিয়ে দেখার কথা বলা হলেও, মাঠে ময়দানে প্রান্তিক মানুষের কাছে সেই পরিষেবা কতটা পৌঁছল, তা নিয়ে আজও বিস্তর ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। সচেতন মানুষের মতে, তৃতীয় পক্ষের গুণমান যাচাইয়ের সার্টিফিকেট দিয়ে মাটির বাস্তবের এই চরম বঞ্চনাকে ধামাচাপা দেওয়া যাবে না।
গুজরাটে সংখ্যালঘুদের উন্নয়নের নামে বছরের পর বছর ধরে চলা এই চরম বঞ্চনা এবং কেন্দ্রীয় অর্থের লভ্যাংশ থেকে রাজ্যটিকে বঞ্চিত রাখার এই প্রবণতা আজ এক বিরাট রাজনৈতিক ও নৈতিক প্রশ্নের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। মুখে ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর চটকদার স্লোগান দিলেও, খোদ প্রধানমন্ত্রীর নিজের রাজ্যেই যদি সংখ্যালঘু কল্যাণমূলক প্রকল্পের এই রুগ্ন ও শূন্য দশা থাকে, তবে তা সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার নামান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়। অবিলম্বে রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে এই বিষয়ে মুখ খুলতে হবে এবং গুজরাটের সংখ্যালঘু উন্নয়নের প্রকৃত হিসাব জনসমক্ষে এনে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে, এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে জোরালো দাবি।






