ইটখলায় অব্যবহৃত কাঠামোর সদ্ব্যবহারের দাবিতে শিলচর জেলা মহিলা কংগ্রেসের হুঁশিয়ারি
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ উন্নয়নের বড় বড় বুলি এবং লাখ লাখ টাকার সরকারি অনুদান ছড়ানোর সুদৃশ্য বিজ্ঞাপনের আড়ালে বরাক উপত্যকার বুকে পড়ে রয়েছে প্রশাসনিক উদাসীনতার এক চরম ও লজ্জাজনক নিদর্শন। শিলচর মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইটখলা বাজার সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি চোখ জুড়ানো সরকারি ভবন গত কয়েক বছর ধরে সম্পূর্ণ অব্যবহৃত ও তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে থেকে ধ্বংসের মুখে এগোচ্ছে।
সরকারি তহবিলের অপচয় এবং জনস্বার্থকে বুড়ো আঙুল দেখানোর এই অন্ধ ও বেপরোয়া নীতির বিরুদ্ধে এবার ফুঁসে উঠেছে শিলচর জেলা মহিলা কংগ্রেস কমিটি। অবিলম্বে এই ভবনের সদ্ব্যবহার না হলে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার জোরালো হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মহিলা কংগ্রেস নেতৃত্ব। নথিপত্র ও সরকারি পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবর্ষে মূলত ২০১৬-১৭ এর আনটাইড ফান্ডের প্রায় ১ কোটি টাকার একটি মহাভিলাষী প্রকল্প হিসেবে এই ভবনটি নির্মাণ করেছিল আসাম সরকার।

‘স্বামী বিবেকানন্দ অডিটোরিয়াম ও গেস্ট হাউস’ নামে এই নামাঙ্কিত সুদৃশ্য ভবনটি নির্মাণের নেপথ্যে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এলাকার সাংস্কৃতিক ও জনহিতকর কাজকর্মে গতি আনা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, উদ্বোধনের পর থেকেই কোনো এক অদৃশ্য কারণে এই ভবনটি সেভাবে আলোর মুখ দেখেনি বা তার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়নি। এরপর পেরিয়ে গেছে বেশ কিছু বছর। ২০২২ সালে কাছাড় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাময়িকভাবে প্রায় এক বছর এই ভবনটিকে শিলচর সদর সার্কেল অফিস হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
কিন্তু সাধারণ মানুষের সামান্য যাতায়াত বা সুবিধার কথা না ভেবে হঠাৎ করেই সেই সার্কেল অফিসটিকেও উঠিয়ে নিয়ে স্থানান্তরিত করা হয় শিলচর সদরঘাটে। তারপর থেকেই পর্যাপ্ত জমি এবং সমস্ত আধুনিক পরিকাঠামো সম্বলিত এই সদ্যনির্মিত সরকারি ভবনটি ভুতুড়ে বাড়ির রূপ নিয়ে গত তিন বছর ধরে তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। লক্ষ লক্ষ মানুষের ঘাম ঝরানো করের টাকায় তৈরি একটি সরকারি সম্পদ এভাবে নষ্ট হতে দেখা কি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে? এই প্রশ্নই এখন জোরালোভাবে তুলছে সচেতন মহল।
ইটখলা সংলগ্ন বৃহত্তর মালুগ্রাম এলাকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সম্ভাবনা অত্যন্ত সুপ্রাচীন ও ব্যাপক। অথচ অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এত বড় একটি ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে আজও সাধারণ মানুষের বিনোদন বা সাংস্কৃতিক চর্চার জন্য একটিও ভালো অডিটোরিয়াম বা ইনডোর মঞ্চ নেই। দিনের পর দিন তরুণ প্রজন্ম ও শিল্পীরা উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন।
অন্যদিকে, চিকিৎসা পরিষেবার দিক থেকেও এই অঞ্চল এক চরম বঞ্চনার শিকার। বৃহত্তর মালুগ্রাম এলাকায় দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তীব্র অভাব রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পূর্বে বর্তমান ৮ নম্বর ওয়ার্ডের (তৎকালীন পুরনো ৩ নম্বর ওয়ার্ড) ভেতরে একটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকলেও কোনো এক রহস্যজনক ষড়যন্ত্র বা খামখেয়ালিপনায় সেটি চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর থেকে কয়েক লক্ষ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে দূরদূরান্তের হাসপাতাল বা চড়া মূল্যের বেসরকারি নার্সিংহোম। সামান্য জ্বর-জারি বা জরুরি চিকিৎসার জন্যও আজ চরমে পোহাতে হয় সাধারণ গরিব মানুষকে। অব্যবহৃত এই সরকারি সম্পত্তি নিয়ে মহিলা কংগ্রেসের সভানেত্রীর নেতৃত্বে দলের পক্ষ থেকে এক অত্যন্ত তীব্র ও ঝাঁঝালো অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
তাঁদের দাবি, অবিলম্বে এই ভবনটিকে হয় একটি আধুনিক ও উন্নত পরিকাঠামো-সমৃদ্ধ অডিটোরিয়ামে রূপান্তরিত করা হোক, যা মালুগ্রামের যুবসমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের দীর্ঘদিনের আশা পূর্ণ করবে; নতুবা এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সাব-সেন্টারে রূপান্তরিত করা হোক, যাতে এলাকার সাধারণ মানুষ মৌলিক চিকিৎসা পরিষেবা থেকে উপকৃত হন।
মহিলা কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে, এই একটিমাত্র ভবন সঠিকভাবে চালু করা গেলে শিলচর কর্পোরেশনের ৬, ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। এই জরুরি ও জনস্বার্থের দাবিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিবেচনা করার জন্য অসমের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, বরাক উপত্যকার দুই দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী, মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, মাননীয় সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রী, কাছাড়ের মাননীয় সাংসদ, উদারবন্দের মাননীয় বিধায়ক, কাছাড়ের জেলা কমিশনার, যুগ্ম স্বাস্থ্য পরিষেবা অধিকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্তাদের কাছে এক জোরালো স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
প্রশাসনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে যদি অবিলম্বে এই কোটি টাকার অব্যবহৃত সরকারি ভবনটির সংস্কার সাধন করে জনকল্যাণে ব্যবহার করা না হয়, তবে আগামী দিনে বৃহত্তর আন্দোলনের পথে নামতে বাধ্য হবে শিলচর জেলা মহিলা কংগ্রেস। প্রশাসনিক উদাসীনতার এই কালো অধ্যায়ের কবে অবসান ঘটে, এখন সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছে ইটখলা ও মালুগ্রামবাসী।





