নির্বাচন কারচুপি ও এসআইআর বিতর্কের মাঝেই সুর বদলাল ওয়াইএসআর কংগ্রেস প্রধানের; কোণঠাসা শাসক শিবির
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ অক্টোবরঃ জাতীয় রাজনীতিতে একদা মোদি সরকারের অনানুষ্ঠানিক সহযোগী বা ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টি সভাপতি তথা অন্ধ্রপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওয়াইএস জগন মোহন রেড্ডির আচমকা অবস্থান বদলে শোরগোল শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। কেন্দ্র সরকারের বিতর্কিত পদক্ষেপগুলিতে বিগত দিনে চোখ বুজে সমর্থন জোগানো জগন এবার নিজের ‘ভুল’ জনসমক্ষে স্বীকার করে নিলেন। ২০২৩ সালে কেন্দ্র সরকারের পাস করানো বহুল বিতর্কিত ‘নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংশোধনী আইন’-এ সমর্থন জানানো যে কত বড় সিদ্ধান্তগত ভুল ছিল, তা এবার খোলাখুলি মানলেন জগন মোহন রেড্ডি।
সরাসরি এনডিএ জোটে না থেকেও একাধিক জাতীয় ইস্যুতে মোদি সরকারের পাশেই থেকেছে তাঁর দল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রকাশ্যে জগনকে ‘সহযোগী’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। তবে ২০২৪-এর বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর এবং সাম্প্রতিক একাধিক স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগের মেঘ জমতেই সুর বদলালেন এই দাপুটে নেতা।
পরীক্ষার্থী নিজে কখনো পরীক্ষক হতে পারে না: কাঠামোগত ত্রুটির বিস্ফোরক অভিযোগ
রবিবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে জগন মোহন রেড্ডি আক্ষেপের সুর নিয়ে বলেন, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনে আমরা কেন্দ্র সরকারকে সমর্থন জানিয়েছিলাম। আজ সেই সিদ্ধান্তের কথা ভেবে আমাদের অনুশোচনা হচ্ছে। সেই ভুল স্বীকার করতে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই। নির্বাচন তো পরীক্ষার মতো এখন কোনো পরীক্ষার্থী কি নিজে নিজের পরীক্ষক বা বিচারক হতে পারে?
জগনের এই রূপক মন্তব্য ভারতীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের স্বাতন্ত্র্য নিয়েই মারাত্মক প্রশ্ন তুলে দিল। জগনের দাবি, বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনার হিসেবে অত্যন্ত সৎ কোনো ব্যক্তি বসলেও পুরো প্রক্রিয়াটি পক্ষপাতদুষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় তাঁর নিরপেক্ষতা জনমনে প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়।
তিন সদস্যের নিয়োগ কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মনোনীত ক্যাবিনেট মন্ত্রীর হাতে দু’টি ভোট থাকে, আর বিরোধীদের হাতে থাকে মাত্র একটি। ফলে ক্ষমতাসীন দল নিজের পছন্দের লোককেই কমিশনার পদে বসিয়ে দেয়। এই ব্যবস্থাকে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর এক ‘গুরুতর ত্রুটি’ হিসেবে উল্লেখ করে ভারতের প্রধান বিচারপতিকে ফের এই নির্বাচন কমিটিতে ফেরানোর দাবি তুলেছেন তিনি।
কী ছিল ২০২৩-এর সেই বিতর্কিত নিয়োগ আইন?
২০২৩ সালে মোদি সরকার সংসদে ‘নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সংশোধনী বিল’ পেশ করে পাস করায়। তার আগে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত নিয়োগ কমিটিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিন্তু কেন্দ্র সংশোধনী এনে শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে একজন কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট মন্ত্রীকে কমিটিতে ঢোকায়।
তৎকালীন সময়ে প্রধান বিরোধী জোট I.N.D.I.A এর বিরুদ্ধে গর্জে উঠে বলেছিল, এই পরিবর্তনের ফলে নির্বাচন কমিশন সরকারের হাতের পুতুলে পরিণত হবে। তবে বিরোধী জোটের দাবিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেদিন কেন্দ্রের পাশে দাঁড়িয়েছিল ওয়াইএসআর কংগ্রেস। আজ সেই সিদ্ধান্তকেই জীবনের বড় ভুল বলে আখ্যা দিচ্ছেন অন্ধ্রপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।
অন্ধ্রে নির্বাচন কারচুপি ও এসআইআর বিতর্কে তোপ
জগন মোহন রেড্ডির এই সুর বদলের নেপথ্যে রয়েছে অন্ধ্রপ্রদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হওয়া তোলপাড়। চন্দ্রবাবু নাইডুর টিডিপি ও বিজেপি-র শরিকি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে স্থানীয় ও পুর নির্বাচনে রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিরোধীদের ভয় দেখানো এবং মনোনয়নে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠছে। জগনের অভিযোগ, কেবল কেন্দ্রেই নয়, রাজ্য স্তরেও রাজ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে একই পক্ষপাতিত্বের ছক চলছে। বর্তমান টিডিপি শাসিত রাজ্য সরকার নিজেদের বিশ্বস্তদের বসিয়ে বিরোধীদের কোণঠাসা করছে।
একই সঙ্গে, ভোটার তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম ও বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধনী প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ ভুয়া ভোটার অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও কেন নির্বাচন পরিচালনা করা হলো, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের পেশাদারিত্বের ওপর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন তিনি। বিরোধীরা যাতে নির্বাচনী প্রস্তুতি বা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ না পায়, সেই হিসেব কষেই কেন্দ্র ও রাজ্যের নির্ঘণ্ট ঘোষণা করা হয় বলেও বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন তিনি।
রাজনীতির মোড়: ক্ষমতার বাইরে আসতেই কি ঘুম ভাঙল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জগন মোহন রেড্ডির এই বক্তব্যকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবেই দেখছেন। ক্ষমতায় থাকার সময় যে সমস্ত দল মোদি সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপে ছায়াসঙ্গী হিসেবে হাত বাড়িয়েছিল, ক্ষমতার বাইরে যেতেই তাদের সেই সিদ্ধান্ত যে ‘ভুল’ হিসেবে স্পষ্ট হচ্ছে, তা ফের প্রমাণিত।
যাই হোক না কেন, মোদি সরকারের অন্যতম সমর্থক শিবিরের এই ইউ-টার্ন কেন্দ্রে বিজেপি-কে আইনি ও রাজনৈতিক উভয় দিক থেকেই তীব্র চাপের মুখে ফেলে দিল। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত করতে এখন সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন মামলায় জগনের এই বয়ান প্রধান অস্ত্র হতে চলেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।





