বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ উন্নয়নের আলো থেকে বহু দূরে থাকা এক প্রত্যন্ত জনপদে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করল কাছাড় জেলার ছোট দুধপাতিল এলাকার কালাচাঁদ মেমোরিয়াল ক্লাব। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে যৌথভাবে এক মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করে ক্লাবটি শিবনগর এলপি স্কুল প্রাঙ্গণে এক বর্ণাঢ্য ও সর্বাত্মক বিনামূল্যে স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন করে।
মঙ্গলবার সকাল ঠিক দশটায় এই শিবির শুরু হওয়ার পর থেকেই এলাকার সাধারণ মানুষ ও খেটে খাওয়া মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের উপস্থিতি এবং বিনামূল্যে জীবনদায়ী ওষুধ বিতরণের এই আয়োজন ওই অবহেলিত জনপদের মানুষের মনে এক নতুন আশার আলো ফুটিয়েছে।
প্রার্থনা ও শুভকামনার মধ্য দিয়ে এদিনের এই স্বাস্থ্য শিবিরের সূচনা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে কালাচাঁদ মেমোরিয়াল ক্লাবের নিবেদিতপ্রাণ সদস্য ও কর্মকর্তাগণ সুদূর শিলচর থেকে আগত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। উপস্থিত বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. সোফিয়া বেগম, ফার্মাসিস্ট ইয়াসিন আলী, জিএনএম নার্স লাচামলিউ গাংমেই এবং সহযোগী কর্মী শম্পা দাসকে ক্লাবের পক্ষ থেকে ঐতিহ্যবাহী উত্তরীয় পরিয়ে ও ফুল দিয়ে সম্মান জানানো হয়।
এর পরেই শুরু হয় স্বাস্থ্য পরীক্ষার মূল পর্ব। ছোট দুধপাতিল-মূরলিধর জিপি এলাকার শিশু, বৃদ্ধ, মহিলাসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, সাধারণ জ্বর-সারি থেকে শুরু করে নানাবিধ দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যার কথা চিকিৎসকদের খুলে বলেন রোগীরা। ডা. সোফিয়া বেগম অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে প্রতিটি রোগীর শারীরিক পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন।
শুধু পরামর্শ দেওয়াই নয়, প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সৌজন্যে সমস্ত রোগীকে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। এদিনের এই শিবিরে বিভিন্ন বয়সের প্রায় ২০০ জন পুরুষ ও মহিলা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর পাশাপাশি বিনামূল্যে ওষুধ সংগ্রহ করে দারুন উপকৃত হন।
শিবিরের সাফল্য ও পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে কালাচাঁদ মেমোরিয়াল ক্লাবের গতিশীল সম্পাদক গোবিন্দ সরকার বলেন, ছোট দুধপাতিল-মূরলিধর জিপি এলাকা বরাবরই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এখানকার সাধারণ মানুষের পক্ষে উন্নত চিকিৎসা বা ওষুধ কেনার সামর্থ্য সবসময় থাকে না। সেই কথা মাথায় রেখেই আমাদের ক্লাবের সদস্যরা এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নয়নে পাশে দাঁড়ানোর ব্রত নিয়েছি। আজকের এই শিবিরের অভূতপূর্ব সাড়া আমাদের আগামী দিনে আরও বড় পরিসরে কাজ করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
অন্যদিকে, চিকিৎসক ডা. সোফিয়া বেগম কালাচাঁদ মেমোরিয়াল ক্লাবের এমন উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, শহর থেকে দূরে এই ধরনের প্রত্যন্ত ও অবহেলিত এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। বহু মানুষ রোগ লুকিয়ে রাখেন বা টাকার অভাবে চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। ক্লাবের এই মহৎ উদ্যোগের ফলে আজ অনেক সাধারণ মানুষ সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও ওষুধ পেলেন। এ ধরনের স্বাস্থ্য শিবির আরও বেশি করে আয়োজন করা প্রয়োজন।
একটি গ্রামীণ এলাকায় এত বড় মাপের স্বাস্থ্য শিবির সফলভাবে সম্পন্ন করা সহজ কথা নয়। নেপথ্যে ছিল একদল উদ্যমী মানুষের নাছোড়বান্দা মানসিকতা ও টিমওয়ার্ক। কালাচাঁদ মেমোরিয়াল ক্লাবের সভাপতি জ্ঞানেন্দ্র বিশ্বাস ও সম্পাদক গোবিন্দ সরকারের সার্বিক নির্দেশনায় এবং অর্জুন সরকার, নীলমণি বিশ্বাস, রাধাকান্ত সরকার, অভিনয় সরকার, প্রদীপ শব্দকর, হিমাংশু সরকার, পরিমল সরকার, দুলাল সরকার, রঞ্জন সরকার, আনন্দ সরকার, শ্রীধাম বিশ্বাস, সুখেন সরকার, লিটন সরকার, জয়নন্দ বিশ্বাস, শ্যাম নমঃশূদ্র, চিত্ত রায়, প্রীতিশ রায়, মোহনলাল সরকার প্রমুখ কার্যকর্তার নিরলস পরিশ্রমে শিবিরটি সফল রূপ নেয়।
এছাড়াও, অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পুরো আয়োজনকে উৎসাহিত করেন অসম গণ পরিষদ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বিশিষ্ট সম্পাদক সুজিত দেব। তাঁর উপস্থিতি এই সামাজিক অনুষ্ঠানকে আরও বেশি গুরুত্ব দান করে। চিকিৎসার আলোহীন কোণে পৌঁছে যাওয়া এই স্বাস্থ্য শিবির প্রমাণ করল যে, সদিচ্ছা থাকলে সমাজসেবার হাত বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব। কালাচাঁদ মেমোরিয়াল ক্লাবের এই মানবিক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ আগামী দিনে বরাক উপত্যকার অন্যান্য অঞ্চলেও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেই মনে করছে সচেতন মহল।







