সিন্ডিকেটের থাবায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে রাজ্য সরকার, প্রতিবাদ করলেই মিলছে প্রাণনাশের হুমকি!
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ৩১ আগষ্টঃ প্রকৃতির বুক চিরে প্রবাহিত নদী-নালা আর সবুজ পাহাড়ের কোল থেকে খনিজ সম্পদ লুটের এক বিভীষিকাময় অধ্যায় রচিত হচ্ছে দক্ষিণ আসামের উধারবন্দে। সরকারের কোষাগারে রাজস্ব জমার ফাঁকা বুলি আর প্রশাসনিক নজরদারির সমস্ত ঢাকঢোল পিটিয়ে যখন উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়, ঠিক তখনই বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণ উলটো। উধারবন্দের দুর্গম ঠালিগ্ৰাম পাথর কোয়ারিতে এখন আইন, নিয়ম ও সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছে একচ্ছত্র বেআইনি কারবার ও পাথর-বালুর মহালুট।
সবচেয়ে লজ্জার এবং উদ্বেগের বিষয় হলো, যে বন বিভাগের ওপর দায়িত্ব রয়েছে বনাঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করার, সেই উধারবন্দ বন বিভাগেরই কিছু সংখ্যক অসাধু কর্মী, উচ্চপদস্থ আধিকারিক এবং দুর্ধর্ষ পাথর মাফিয়াদের সঙ্গে এক গভীর গোপন বোঝাপড়া বা ‘সিন্ডিকেট রাজ’-এর হাত ধরেই এই অবাধ দুর্নীতি ফুলেফেলে উঠছে। দিনের পর দিন ধরে চলা এই লাগামহীন হরিলুটের ফলে আসাম সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে, আর পকেট ভারী হচ্ছে গুটিবাজ কিছু অসাধু ব্যক্তির।
নির্দিষ্ট পরিমাপের পারমিটকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চার সিএম এর পারমিটে পাচার হচ্ছে দশ-এগারো সিএম পাথর
ঠালিগ্ৰাম পাথর কোয়ারি থেকে কীভাবে সরকারি নিয়মকে ফাঁকি দিয়ে খনিজ সম্পদ তছরুপ করা হচ্ছে, তার চিত্রটি রীতিমতো চোখ কপালে তোলার মতো। স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্যানুযায়ী, কাগজে-কলমে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়ম মেনে চার সেন্টিমিটার (৪ সিএম) আকৃতির পাথর উত্তোলনের পারমিট বা অনুমতি দেওয়া হলেও, বাস্তবে কোয়ারি চত্বরে বুক চিতিয়ে পাচার করা হচ্ছে দশ থেকে এগারো সেন্টিমিটার (১০/১১ সিএম) সাইজের দানবাকৃতি সব পাথরখণ্ড। একইভাবে ছোট ছোট গাড়ির ক্ষেত্রে দুই সেন্টিমিটারের (২ সিএম) পারমিটের আড়ালে বহুগুণ বেশি ওজনের ওভারলোড পাথর এবং বালু বোঝাই করে প্রতিদিন দস্যুর মতো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বড় বড় ঘাতক ডাম্পার ও ট্রাক।

অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের দুর্নীতিগ্রস্ত ও ঘুঘুপোকা কর্মীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদত ছাড়া এই ধরনের দিনের আলোর খোলামেলা ওভারলোডিং এবং নিয়মের নগ্ন লংঘন এক মুহূর্তের জন্যও সম্ভব নয়। কোয়ারির মাফিয়া মহালদারদের সঙ্গে বনকর্মীদের এই ‘গভীর মিতালি’র জেরে নির্ধারিত রয়্যালটির সিকিভাগও জমা পড়ছে না সরকারি কোষাগারে। অথচ এই অবৈধ কারবারের জেরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে এলাকার গ্রামীণ সড়কগুলি, চরম হুমকির মুখে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা।
বনকর্মী ও পাথর মাফিয়াদের গোপন বোঝাপড়ায় উধারবন্দের পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, চাঞ্চল্যকর অভিযোগ
এই বেআইনি কারবার ও চরম দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখনই এলাকার সাধারণ মানুষ, যুবক বা সচেতন নাগরিকরা মুখ খুলতে বা প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এসেছেন, তখনই তাঁদের ওপর নেমে এসেছে মাফিয়াদের ঠান্ডা মাথার হুমকি। প্রতিবাদ করলেই মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া কিংবা প্রাণনাশের ভয় দেখানোর মতো চরম হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। ভয়ের চোটে আজ ঠালিগ্ৰাম ও পার্শ্ববর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ কার্যত বাকরুদ্ধ।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়ঙ্কর জায়গায় পৌঁছেছে যে, সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ তথা সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতেও বিন্দুমাত্র পিছপা হচ্ছে না এই সিন্ডিকেট। সম্প্রতি ঠালিগ্ৰাম কোয়ারি এলাকায় এই লাগামহীন পাথর লুটের খবর সংগ্রহ করতে এবং ছবি তুলতে যাওয়া এক পেশাদার সংবাদকর্মীকেও বাধা দেওয়া হয়। অভিযোগ উঠেছে, বন বিভাগেরই এক অস্থায়ী কর্মী এবং পাথর কোয়ারির লাঠিয়াল বাহিনী সংবাদকর্মীকে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে চরম নিগ্রহ করে ও সংবাদ সংগ্রহ করতে বাধা দেয়। চতুর্থ স্তম্ভের ওপর এমন নগ্ন হামলা ও হুমকি প্রমাণ করে যে, এই কোয়ারি চত্বরে আইন বা সংবিধানের কোনো বালাই নেই, এখানে কেবল মাফিয়াদের হুকুমই শেষ কথা।
পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে যত্রতত্র নদীর তলদেশ ও পাহাড়ের বুক চিরে দেদার পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে অদূর ভবিষ্যতে উধারবন্দ অঞ্চলে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। আসাম সরকার যখন রাজ্যের পরিকাঠামো উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্প রূপায়ণ করতে গিয়ে কোষাগারের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন, ঠিক তখনই উধারবন্দের মতো এলাকায় বন বিভাগের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার ব্যক্তিস্বার্থের খামখেয়ালিপনায় রাজ্য সরকারের রাজকোষে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট চক্রের দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে শেষ পর্যন্ত এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজ মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন।
অবৈধ সিন্ডিকেটের পাণ্ডা ও মদতদাতা দুর্নীতিগ্রস্ত বনকর্মীদের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী ও বনমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের দাবি
উধারবন্দের মাটি থেকে চলা এই লাগামহীন পাথর ও বালু চুরির বিরুদ্ধে অবিলম্বে রাজ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের কঠোর তদন্তের দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা। ঠালিগ্ৰাম কোয়ারির এই দুর্নীতির জাল কতদূর বিস্তৃত এবং এর নেপথ্যে কোন কোন রাঘববোয়াল বন কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মাফিয়া মদত জুগিয়ে চলেছেন, তা খুঁজে বের করতে আসামের মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যের বনমন্ত্রী এবং বন বিভাগের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিকরা। অবিলম্বে এই সিন্ডিকেটের পাণ্ডা ও তাদের পোষ্য অসাধু বনকর্মীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে বৃহত্তর ও তীব্র গণআন্দোলনের হুংকার দিয়ে রেখেছেন এলাকাবাসী।





