বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৯ আগষ্টঃ সহিংসতার ক্ষত এখনও শুকায়নি, বহু পরিবারের স্বজন হারানোর কান্না এখনও থামেনি। পাহাড়ে সমতলে জাতিগত সংঘাতের রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে মণিপুরের রাজনীতি ও সমাজচিত্র। কারণ একটাই জাতীয় জনসংখ্যা শুমারি বা লোকগণনা। তবে বিতর্ক শুমারি কেন্দ্র করে নয়, বিতর্ক শুমারির সময়ের বাধ্যবাধকতা নিয়ে। রাজ্যজুড়ে এখন এক সুর ও এক দাবি, আগে এনআরসি উন্নীতকরণ, তারপর জনশুমারি।
বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানী ইম্ফলের রাজপথ হঠাৎই যেন আগুনের রূপ নেয়। জাতীয় লোকগণনা অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার ঠিক প্রাক্কালে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) উন্নীতকরণের চরম দাবিতে রাজপথে নামেন বিপুল সংখ্যক ‘মেইরা পাইবি’ (মণিপুরের শক্তিশালী ও ঐতিহ্যবাহী নারী প্রতিবাদী সমাজ) কর্মী। ক্যাম্পেইন ফর জাস্টিস অ্যান্ড ফেয়ার ডিলিমিটেশন’-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং ‘নর্থ ইম্ফল মেইরা ও ক্লাব কো-অর্ডিনেটিং কমিটি’র উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল এই সুবৃহৎ মশাল মিছিল।
বৃহস্পতিবারের সূর্যাস্তের পর শত শত মেইরা পাইবি নারী হাতে আগুনের মশাল তুলে নেন। কইরেংগেই গ্রাম থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ মশাল মিছিলটি ২ নম্বর জাতীয় সড়কের কোল ঘেঁষে লুয়াংসাংবাম গ্রামের লিবারেল কলেজের দিকে এগিয়ে যায়।
রাতের অন্ধকারে মেইরা পাইবি কর্মীদের হাতের আগুনের মশাল যেন সরকারের নীতিহীন ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের অগ্নিশিখা হয়ে জ্বলে ওঠে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই আন্দোলন কেবল একদিনের কোনো বিচ্ছিন্ন ক্ষোভ প্রকাশ নয়; এটি মণিপুরের মেইতেই সমাজের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নিরাপত্তার আশঙ্কারই এক বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ।
মণিপুরে আসন্ন লোকগণনার আগে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি কার্যকর করার দাবিতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন ক্রমশ গণআন্দোলনের রূপ নিচ্ছে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, এনআরসি-র মাধ্যমে নাগরিকত্বের বিষয়টি স্পষ্ট না করে লোকগণনা হলে রাজ্যের জনমিতিক চরিত্র স্থায়ীভাবে বদলে যেতে পারে।
২৩ আগস্ট টিডিম সড়কের পাশে মেইরা পাইবি কর্মীদের নেতৃত্বে একটি বিশাল মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা এনআরসি-র দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরেন এবং লোকগণনার আগে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির দাবি জানান।
এর আগে, ২০ আগস্ট ক্যাম্পেইন ফর জাস্টিস অ্যান্ড ফেয়ার ডিলিমিটেশন এর আহ্বানে ইম্ফলে বড় আকারের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে ব্যারিকেড বসানোর পাশাপাশি টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করতে হয় বলে জানা যায়। ১৬ আগস্ট জেএফডি-র নেতৃত্বে উপায়ুক্তের কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করা হয়। আন্দোলনকারীরা স্মারকলিপি দিয়ে লোকগণনা স্থগিত রাখার জন্য প্রশাসনের কাছে জোরালো দাবি জানান।
শুধু ইম্ফলেই নয়, উরিপক-কাংচুপ সড়ক, টিডিম সড়ক, কংবা সড়ক এবং খুরাই-লামলং এলাকাতেও ধারাবাহিকভাবে প্রতিবাদ মিছিল ও অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ফলে এনআরসি-র দাবি ঘিরে মণিপুরে আন্দোলনের পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের মূল বক্তব্য, রাজ্যের বর্তমান জনমিতিক পরিস্থিতি, নাগরিকত্ব এবং সীমা পুনর্নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি স্পষ্ট না করে লোকগণনা করা হলে ভবিষ্যতে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। তাই লোকগণনার আগে এনআরসি-কে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন আরও জোরদার করার বার্তা দিয়েছেন তাঁরা।
মিছিলে অংশ নেওয়া এক প্রতিবাদকারী ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, আমরা আগেই রাজ্য সরকারকে আবেদন জানিয়েছিলাম যে এখন লোকগণনা করবেন না। কারণ মণিপুরের বর্তমান সামাজিক ও নিরাপত্তার পরিস্থিতি একেবারেই ভালো নয়। সরকার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছিল, কয়েকজন বিধায়ক দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে এই নিয়ে কথা বলবেন। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি!
আমাদের লোকপিয়ল নিয়ে কোনো আপত্তি নেই, তবে তার আগে সঠিক এনআরসি করতে হবে। প্রতিবাদীদের এই ক্ষোভ অত্যন্ত যৌক্তিক ও প্রাসঙ্গিক। মণিপুরে দীর্ঘ দিন ধরেই পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমার থেকে অবৈধ অনুপ্রবেশের গুরুতর অভিযোগ উঠে আসছে। সীমান্ত পার করে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের নাগরিক হিসেবে নথিভুক্ত করার চক্রান্ত চলছে, এমন আশঙ্কা বহুদিনের।
এই অবস্থায় যদি এনআরসি না করে তড়িঘড়ি করে লোকগণনা বা জনসংখ্যা গণনা শুরু হয়ে যায়, তবে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীরাও সরকারি রেকর্ডে স্থান পেয়ে যাবে। ফলে মণিপুরের ভূমিপুত্র ও দীর্ঘদিনের অধিবাসীরা নিজ ভূমিতেই সংখ্যালঘুতে পরিণত হবেন।
মণিপুরের বর্তমান অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বয়হীনতাকে সরাসরি দায়ি করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। রাজ্য সরকার জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে বিধায়করা কেন্দ্রে গিয়ে এনআরসি ও শুমারি বিষয়ে ইতিবাচক পথ খুঁজবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি শেষ পর্যন্ত সস্তা ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে।
যে মণিপুরে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সহিংসতার আগুন জ্বলছে, যেখানে বহু মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে ত্রাণ শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন, সেখানে জনসংখ্যা গণনার মতো স্পর্শকাতর কাজ শুরু করা কতটা যুক্তিযুক্ত? এই উদ্বাস্তু মানুষদের বাদ দিয়ে কি সঠিক লোকপিয়ল আদৌ সম্ভব? অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কেন্দ্র সরকার ও রাজ্য প্রশাসন পুরোপুরি ব্যর্থ।
এই অনুপ্রবেশ সমস্যা সমাধান না করে জোর করে জনশুমারি চাপিয়ে দেওয়া মানে আগুন নিয়ে খেলার শামিল। অশান্ত মণিপুরে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’র যে বুলি বারবার সরকার দিয়ে আসছে, নীতিহীন লোকগণনার সিদ্ধান্ত সেই শান্তিকে আরও দূরে ঠেলে দিচ্ছে। মেইরা পাইবির এই রাজপথের আগুন কেবল প্রদীপের শিখা নয়, তা হলো এক গণবিস্ফোরণের আগাম সংকেত।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ও মণিপুর রাজ্য সরকার যদি অবিলম্বে আন্দোলনকারীদের যৌক্তিক দাবি না মানে এবং এনআরসি উন্নীতকরণ ছাড়া জোরপূর্বক শুমারি চালানোর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়, তবে মণিপুরে যে আগ্নেয়গিরির মতো নতুন করে দাবানল জ্বলে উঠবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারের উচিত জেদ বর্জন করে দ্রুত এনআরসির রূপরেখা প্রকাশ করা এবং মণিপুরের জনমিতি ও অখণ্ডতা রক্ষার সুস্পষ্ট বার্তা দেওয়া।




