শিক্ষা ও গবেষণাকে সাধারণ মানুষের কল্যাণে লাগানোর আহ্বান ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার।
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ উন্নয়ন, ঐতিহ্য এবং প্রযুক্তির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুকুটে যুক্ত হলো আরও এক গৌরবের অধ্যায়। অসম তথা সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের উচ্চশিক্ষার মুকুটহীন সম্রাট আইআইটি গুয়াহাটি মঙ্গলবার জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাদের ৩৩তম প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন করল।
উত্তর গুয়াহাটিতে অবস্থিত এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের চত্বরে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। প্রতিষ্ঠা দিবসের এই মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন যে, আগামী দিনে অসমের পাশাপাশি সমগ্র অঞ্চলের উন্নয়নে প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ক্ষেত্রে প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি।

প্রতিষ্ঠা দিবসের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা স্মরণ করান আইআইটি গুয়াহাটি প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাস। তিনি বলেন, খড়গপুরে দেশের প্রথম আইআইটি স্থাপনের দীর্ঘ ৪৩ বছর পর, ১৯৯৪ সালে বহু প্রত্যাশিত এই প্রতিষ্ঠানটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক অসম চুক্তি স্বাক্ষরের সময় রাজ্যে একটি বিশ্বমানের আইআইটি স্থাপনের দাবিটি ছিল এ অঞ্চলের মানুষের অন্যতম প্রধান এবং জোরালো দাবি।
মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, আইআইটি গুয়াহাটির গুরুত্ব কেবল শিক্ষাক্ষেত্রে বা পাঠ্যপুস্তকের উৎকর্ষের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং স্বপ্ন পূরণের জীবন্ত প্রতীক। অসমের মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যে সমস্ত জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, তাত্ত্বিক জ্ঞানকে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সমাধানে রূপান্তর করার ক্ষমতা অর্জনই হবে এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি।
অসম সরকার ও আইআইটি গুয়াহাটির মধ্যে বর্তমান সময়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন যৌথ ও সহযোগিতামূলক উদ্যোগের প্রশংসা করে মুখ্যমন্ত্রী বেশ কিছু যুগান্তকারী প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, অসম অ্যাডভান্সড হেলথকেয়ার ইনোভেশন ইনস্টিটিউট, লো-ফিল্ড এমআরআই, সার্জিক্যাল রোবোটিক্স এবং উদ্ভিদভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে উচ্চমানের গবেষণা।

পাশাপাশি, ভবিষ্যতের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জন্য তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ করে তোলা, ড্রোনের মাধ্যমে বন্যা মোকাবিলা ব্যবস্থা এবং মহিলা-নেতৃত্বাধীন উদ্যোগগুলির বিকল্প ঋণ মূল্যায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা র ব্যবহারেও এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে তিনি জানান।
রাজ্যের উদীয়মান শিল্প-পরিবেশের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, অসম বর্তমানে সেমিকন্ডাক্টর ও উন্নত উৎপাদন ক্ষেত্রের একটি বড় হাব হিসেবে গড়ে উঠছে। ফলে মানবসম্পদ উন্নয়নের তীব্র প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। রাজ্যের তরুণ প্রজন্মকে এই নতুন শিল্প ও প্রযুক্তি হাবের সরবরাহ শৃঙ্খল এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে নিজেদের তৈরি করতে হবে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের চিরচেনা প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে ড. শর্মা আইআইটি গুয়াহাটি বিজ্ঞানী ও গবেষকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান। তিনি বন্যা-সহনশীল পরিকাঠামো নির্মাণ, বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি পদ্ধতি, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং উন্নত নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে আরও বড় অবদান রাখার আহ্বান রাখেন। গুয়াহাটিসহ রাজ্যের অন্যান্য দ্রুতবর্ধনশীল শহরগুলির গণপরিবহন, জল নিষ্কাশন এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানসম্মত সমাধানের ওপর জোর দেন তিনি।
এদিনের ভাষণে মুখ্যমন্ত্রী এক নতুন ও আকর্ষণীয় স্লোগান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চা, বৃক্ষ এবং প্রযুক্তি এই ত্রিমুখী ক্ষেত্রই আগামী দিনে অসমের ভবিষ্যৎকে পরিপূর্ণভাবে আলোকিত করবে। এই তিনটি ক্ষেত্র একদিকে যেমন রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী অর্থনৈতিক শক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে প্রতিনিধিত্ব করে, অন্যদিকে তেমনই প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং উন্নত সামগ্রী উৎপাদনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া নতুন সুযোগগুলিরও দিগ্দর্শন ঘটায়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল মুখ্যমন্ত্রীর একটি বড় জনকল্যাণমূলক ঘোষণা। অসম সরকার আইআইটি গুয়াহাটির মেধাবী ও উদীয়মান শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০টি বিশেষ বৃত্তি প্রদানে আর্থিক সহায়তা করবে বলে ঘোষণা করেন তিনি। এই উদ্যোগ যাতে দ্রুত ও সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার জন্য আইআইটি গুয়াহাটির পরিচালককে অবিলম্বে একটি উপযুক্ত ও কার্যকরী কাঠামো প্রস্তুত করার আহ্বান জানান ড. শর্মা।
এছাড়াও, আইআইটি গুয়াহাটি, রাজ্য সরকার, শিল্পক্ষেত্র, স্টার্ট-আপ, বিশ্ববিদ্যালয়, নাগরিক সমাজ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও নিবিড় ও শক্তিশালী সহযোগিতা গড়ে তোলার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।
প্রযুক্তির হাত ধরে রূপান্তর সাধনের ক্ষেত্রে সমগ্র দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠানটির গবেষক ও ছাত্রছাত্রীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে এবং এমন সক্ষমতা তৈরি করতে হবে, যা অসমকে আরও বেশি আত্মবিশ্বাস ও গতিশীলতার সঙ্গে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
প্রতিষ্ঠা দিবসের এই মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আইআইটি গুয়াহাটির সম্মানিত পরিচালক অধ্যাপক দেবেন্দ্র জালিহাল, প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার অন্যতম প্রধান কারিগর অধ্যাপক আর. সি. মালহোত্রা, আইআইটি-র প্রাক্তন পরিচালকরা, বিশিষ্ট অধ্যাপক-অধ্যাপিকা এবং বিপুল সংখ্যক উৎসাহী শিক্ষার্থী।
আগামী দশকগুলিতে আইআইটি গুয়াহাটি কেবল শিক্ষাগত সাফল্যের নিরিখেই নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারছে, তার মাধ্যমেই নিজেদের পরিচিতি আরও উজ্জ্বল করবে, এই আশাবাদ ব্যক্ত করেই ৩৩তম প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।






