মইনুল হক বরাকবাণী প্রতিনিধি শ্রীভুমি ২৩ নভেম্বরঃ আসাম রাজ্যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতিকে বাড়তি অক্সিজেন দিতে শাসক দল বিজেপি যে প্রশাসনিক কৌশল নিয়েছে, তার সবথেকে বড় উদাহরণ বদরপুর সমষ্টির বিলুপ্তি। করিমগঞ্জ জেলার ঐতিহাসিক জনপদ বদরপুর, যা বরাক উপত্যকার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত, আজ কার্যত মানচিত্রেই নেই। কাটিগড়া, উত্তর করিমগঞ্জ ও রামকৃষ্ণনগরের সঙ্গে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে সমষ্টির অস্তিত্ব। বদরপুর শুধু একটি শহর নয়, এটি ছিল বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক অগ্রগতির প্রতীক।
ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা রেলওয়ে কেন্দ্র, পরবর্তীতে পৌরসভা, এনটিপিএস এর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র সব মিলিয়ে বদরপুর ছিল অঞ্চলের অন্যতম সবল উপকেন্দ্র। এখানকার সমষ্টি থেকে বহু মন্ত্রী, বিধায়ক উঠে এসেছে, যাঁরা রাজ্যের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। কিন্তু বিজেপি সরকারের বদলে যাওয়ার রাজনীতিতে বদরপুরের মতো ঐতিহাসিক সমষ্টিও রক্ষা পেল না। কেন্দ্রীয় সরকারের ডিলিমিটেশন কমিশনের নিয়ম কানুনকে উপেক্ষা করেই বদরপুর সমষ্টিকে ভেঙে ফেলা হয়েছে, এমনই অভিযোগ বিরোধী দল কংগ্রেসের।
অভিযোগ আরও গুরুতর এক বিশেষ সম্প্রদায়ের ভোটকে দুর্বল করতেই বদরপুরকে ভেঙে তিনভাগে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বরাক উপত্যকায় যেখানে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেখানে সমষ্টি কমিয়ে বরাককে ১৫ থেকে ১৪ তে নামিয়ে আনা হয়েছে এটা কি ন্যায়সংগত? রাজ্যের অন্যান্য অংশে সমষ্টি বাড়ানো হলেও বরাকে কমানো হয়েছে। এটি সুস্পষ্ট বৈষম্য, যার শিকার বরাকের বাঙালি জনগোষ্ঠী। এই অন্যায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন বদরপুর ব্লক কংগ্রেস সভাপতি জাকারিয়া আহমেদ পান্না ৩০ অক্টোবর ২০২৩-এ সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেন, (কেস নং: W.P(C) 001223/2023)।
আগামী ২৪ নভেম্বর এই মামলার শুনানি। এই ইস্যু নিয়ে দিল্লিতে বরিষ্ঠ আইনজীবী ফুজাইল আহমেদ আয়ুবীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন জাকারিয়া। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ডিলিমিটেশনের নামে সমষ্টি বিলুপ্তি সম্পূর্ণ অবৈধ। জনসংখ্যা বাড়ছে, অথচ সমষ্টি কমানো হচ্ছে, এটা গণতন্ত্র নয়, এটা রাজনৈতিক প্রতিশোধ। জাকারিয়ার আশা ২০২৭ সালের জাতীয় ডিলিমিটেশনে বদরপুর আবার সমষ্টি হিসেবে পুনরুজ্জীবিত হবে। সমষ্টি কেটে নেওয়ার সময় বরাকের বিজেপি মন্ত্রী ও বিধায়কদের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ উগড়ে দেন জাকারিয়া আহমেদ। তিনি বলেন, যে সমষ্টির ভোটে তাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, সেখানে সরকার সেই সমষ্টিই কেটে নিল আর তাঁরা ব্যক্তিগত স্বার্থে চুপ করে দর্শকের মতো গ্যালারিতে বসে মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রদায়িক ম্যাচ দেখলেন। এটা লজ্জাজনক।
জাকারিয়া আহমেদ দৃঢ় কণ্ঠে জানান, বাঙালি বিদ্বেষী নীতির বিরুদ্ধে লড়াই আমি চালিয়ে যাব। আদালতের উপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে বদরপুর সমষ্টি ফিরেই আসবে। তিনি আরও বলেন, এই লড়াই কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তির জন্য নয়, এ লড়াই বদরপুরের গৌরব, বরাকের অধিকারের জন্য। বদরপুরের মানুষের আত্মপরিচয়, ইতিহাস এবং উন্নয়নকে রক্ষা করতেই তাঁর সংগ্রাম। স্থানীয় মহলের বক্তব্য, রাজনীতির স্বার্থে বদরপুরকে ভেঙে ফেলা হয়েছে। বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলের রাজনৈতিক শক্তিকে কমাতে পরিকল্পিত ভাবে সমষ্টি পুনর্গঠন করা হয়েছে।
একজন প্রবীণ শিক্ষক বলেন, বরাকের মানুষ সবসময় উপেক্ষার শিকার। এখন তো সেই উপেক্ষা শাসকের খোলাখুলি নীতি হয়ে উঠেছে। বদরপুর সমষ্টির বিলুপ্তি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি বরাক উপত্যকার মানুষের অস্তিত্ব ও স্বার্থকে ঘিরে যন্ত্রণাদায়ক প্রশ্ন তুলে দেয়। সুপ্রিম কোর্টে লড়াই এখন শেষ আশা বদরপুর আবার মানচিত্রে ফিরে আসবে কি না, তা নির্ভর করছে আদালতের রায়ে। কিন্তু একটাই সত্য বদরপুরের মানুষ তাদের পরিচয়, ইতিহাস এবং অধিকারের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।






