বরাকবাণী প্রতিবেদন, কচুদরম ২রা নভেম্বরঃ বরাক উপত্যকা সহ গোটা অসমে দিনকে দিন তীব্রতর হচ্ছে এনএইচএম (ন্যাশনাল হেলথ মিশন) কর্মীদের আন্দোলন ও কর্মবিরতি। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে স্বাস্থ্য পরিষেবা কার্যত ভেঙে পড়েছে। হাসপাতাল থেকে উপকেন্দ্র, শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম সব জায়গাতেই চরম বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।
এরই প্রভাবে সোনাই সমষ্টির অন্তর্গত স্বাধীনবাজার হাইস্কুলে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাগা স্বাস্থ্য শিবির বাতিল হয়ে যায়। নির্ধারিত তারিখ ছিল ৩০ অক্টোবর, কিন্তু শিবিরটি বাতিল ঘোষণা করা হয় একদিন আগেই ২৯ অক্টোবর বিকেলের দিকে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার আশায় থাকা শতাধিক গ্রামবাসীর আশা মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
স্বাধীনবাজারে বাতিল ম্যাগা স্বাস্থ্য শিবির, পোলিও টিকাদানও বন্ধ; আশাদের ক্ষোভে ফুঁসছে গ্রামাঞ্চল
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই ম্যাগা স্বাস্থ্য শিবিরের আয়োজন নিয়ে স্বাধীনবাজারে ছিল উৎসবের আমেজ। স্কুলের প্রাঙ্গণে মঞ্চ, টেন্ট, টেবিল-চেয়ার, চিকিৎসা সামগ্রী সবই প্রস্তুত ছিল। গ্রামের আশা কর্মীরা দিনরাত ঘরে ঘরে হেঁটে ১৮ বছরের নিচে ছেলে-মেয়ে, শিশু এবং বিশেষ অসুস্থদের তালিকা প্রস্তুত করেছিলেন। একজন আশা কর্মী ক্ষোভের সুরে বলেন, আমরা সকাল থেকে রাত অবধি ঘুরে ঘুরে তালিকা বানিয়েছি, কারো বাড়ি বাদ দিইনি।
কিন্তু শেষ মুহূর্তে জানানো হল শিবির হবে না! আমাদের এত কষ্টের কি মূল্য? এমন ক্ষোভের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা গ্রামীণ এলাকায়। অনেকেই বলেন, এই আন্দোলনের ফলে গ্রামের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে পোলিও ভ্যাকসিনেশন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে।
আমরা সরকারের শত্রু নই, ন্যায্য দাবির জন্যই লড়ছি
এনএইচএম কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন নিয়মিতকরণ, বকেয়া ভাতা প্রদান, ও কাজের স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণ। অভিযোগ, রাজ্য সরকার তাদের দাবি বারবার উপেক্ষা করেছে। এর প্রতিবাদেই তারা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে নেমেছেন। ফলে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপকেন্দ্র ও আউটরিচ ক্যাম্প সব জায়গাতেই কার্যত তালা ঝুলছে। এই কর্মবিরতি চলবে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত, এমনটাই জানিয়েছেন আন্দোলনরত কর্মীরা।
এদিকে সদৌ অসম আশা সংস্থা জানিয়েছে, তারা এনএইচএম কর্মীদের আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানালেও সরাসরি অংশ নেবে না। কারণ, এনএইচএমের পক্ষ থেকে তাদের কাছে এখনও পর্যন্ত কোনও লিখিত বার্তা বা আহ্বান পৌঁছেনি। বরাক উপত্যকার স্থানীয় আশা ইউনিটগুলিও একই অবস্থান নিয়েছে।
এনএইচএম আন্দোলনের আগুনে পুড়ছে রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসা বন্ধ, জীবন বিপন্ন, দাবি অব্যাহত!
তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা, গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা কার্যত স্থবির। নতুন জন্ম নেওয়া শিশুদের ও গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক স্থানে রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দরজায় দাঁড়িয়ে ফিরে যাচ্ছেন। আমরা সরকারের শত্রু নই, ন্যায্য দাবির জন্যই লড়ছি, আন্দোলনরত এক এনএইচএম কর্মীর বক্তব্য, আমরা কাজ করতে চাই, কিন্তু ন্যায্য মজুরি ও চাকরির নিরাপত্তা ছাড়া কতদিন? সরকারের কাছে অনুরোধ আমাদের দাবি দ্রুত মেনে নিয়ে পরিষেবা পুনরায় চালু করা হোক।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষ বলছেন, সরকার ও আন্দোলনরত কর্মীদের মধ্যকার এই সংঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অসহায় গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। এই ঘটনাকে শুধু একদিনের কর্মবিরতি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি হলো দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অব্যবস্থার ফল। একদিকে এনএইচএম কর্মীরা ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য পথে নামছেন, অন্যদিকে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো দরিদ্র মানুষ।
আশাদের নীরব সমর্থন, তবে আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ নয়
প্রশাসনের উচিত ছিল বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে অন্তত গ্রামীণ স্বাস্থ্য শিবিরগুলো চালু রাখা। কারণ, এমন শিবিরের ওপর নির্ভর করে বহু দরিদ্র পরিবারের চিকিৎসা ও টিকাদান। এই দায় এড়ানো যায় না সরকারেরও, যেভাবে হুট করে শিবির বাতিল করা হয়েছে। বর্তমানে বরাক উপত্যকা সহ সারা অসমে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যে বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় হলো আলোচনা ও সমঝোতা।
সরকার ও আন্দোলনরত কর্মীরা যদি দ্রুত সমাধানে না পৌঁছান, তবে এর ভয়াবহ ফল ভোগ করতে হবে সাধারণ মানুষকেই। এনএইচএম আন্দোলনের আগুনে পুড়ছে রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসা বন্ধ, জীবন বিপন্ন, দাবি অব্যাহত!






