সাধারণের জন্য বুলডোজার, নেতার জন্য উপহার? বদোদরা পুরসভার জমি কাণ্ডের রাজনীতি ঘিরে চাঞ্চল্য!
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২০ অক্টোবরঃ রাজনীতিতে দলবদল নতুন কিছু নয়, কিন্তু সেই পটপরিবর্তন যদি নিমেষে একজন বিতর্কিত হাই-প্রোফাইল নেতার ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দেয়, তবে তাকে কেবল ‘রাজনৈতিক সমীকরণ’ না বলে তেলেসমাতি বলাই শ্রেয়! বেআইনিভাবে সরকারি জমি জবরদখল করার অপরাধে যাঁকে আদালতের বারান্দায় ঘাম ঝরাতে হচ্ছিল, হাইকোর্টে জোড়া ধাক্কা খেয়ে যাঁর ঘাড় থেকে ক্ষতিপূরণের খাঁড়াও ঝুলছিল, তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে এনডিএ শিবিরে নাম লেখাতেই সেই ইউসুফ পাঠানের ওপর যেন আশীর্বাদের হাতছানি দিল গুজরাত সরকার।
প্রায় ২০ কোটি টাকা বাজারমূল্যের এক হাজার বর্গমিটার সরকারি জমি এখন প্রাক্তন তারকা ক্রিকেটার তথা সাংসদ ইউসুফ পাঠানের হাতে তুলে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়েছে। যার মধ্যে অর্ধেক জমি একেবারে নিখরচায় ‘উপহার’ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে এবং বাকি অর্ধেকের দামেও দেওয়া হচ্ছে বিশাল অঙ্কের ছাড়। তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন দলে যোগ দেওয়ার পরেই ইউসুফের এই ‘অচ্ছে দিন’ এখন জাতীয় রাজনীতি ও গুজরাতের প্রশাসনিক মহলে তীব্র বিতর্কের ঝড় তুলেছে।
বিবাদের সূত্রপাত: ২০১২ সালের আবদার ও জবরদখলের কলঙ্ক
ঘটনার সূত্রপাত ২০১২ সালে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে নিজের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে গুজরাতের বদোদরা পুরসভার অন্তর্গত তান্দলজায় নিজের বাংলো লাগোয়া ১০০০ বর্গমিটার সরকারি জমিটির ওপর মালিকানা দাবি করেছিলেন ইউসুফ পাঠান। নিলামের পথে না হেঁটে সরাসরি ৯৯ বছরের ইজারায় জমিটি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চালান তিনি। ২০১২ সালের মার্চে ভারতের জার্সি গায়ে শেষ ম্যাচ খেলা ইউসুফের সেই প্রস্তাবে তৎকালীন বদোদরা পুরসভার স্ট্যান্ডিং কমিটি ও জেনারেল বোর্ড সিলমোহরও দিয়েছিল। সেই সময় জমিটির বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫.৬ কোটি টাকা, যা পুরোটা মেটাতেও রাজি ছিলেন ইউসুফ।
কিন্তু বাদ সাধে রাজ্য সরকার। ২০১৪ সালের জুন মাসে গুজরাত সরকারের নগরোন্নয়ন বিভাগ সেই প্রস্তাব সরাসরি খারিজ করে দেয়। এরপরই শুরু হয় আসল বিতর্ক। বদোদরা পুরসভার পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে, প্রস্তাব খারিজ হওয়া সত্ত্বেও ইউসুফ পাঠান বেআইনিভাবে জমিটি জবরদখল করে নিয়েছেন এবং তার চতুর্দিকে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে ফেলেছেন।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর কেন্দ্র থেকে অধীররঞ্জন চৌধুরীকে পরাজিত করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘাসফুল শিবিরের টিকিটে সাংসদ নির্বাচিত হন ইউসুফ পাঠান। এর ঠিক পরপরই জুন মাসে জবরদখল করা ওই জমি থেকে কাঁটাতার সরিয়ে নেওয়ার নোটিস ধরায় বদোদরা পুরসভা। পুরসভার সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে গুজরাত হাইকোর্টের সিঙ্গল বেঞ্চের দ্বারস্থ হন ইউসুফ। কিন্তু ২০২৫ সালের অগাস্ট মাসে হাইকোর্ট তাঁর আবেদন খারিজ করে দিয়ে জানিয়ে দেয়, তারকা বা ভিভিআইপি হলেই আইনের কোনো ছাড় মিলবে না।
সিঙ্গল বেঞ্চের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে ডিভিশন বেঞ্চে যান ইউসুফ। কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে ডিভিশন বেঞ্চও তাঁর আবেদন খারিজ করে মৌখিক পর্যবেক্ষণে জানায়, জবরদখল প্রমাণিত হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক ক্ষতিপূরণও চাপানো উচিত। আইনি জাঁতাকলে যখন কোণঠাসা ইউসুফ, ঠিক তখনই জাতীয় রাজনীতিতে ঘটে এক মহাবদল!
তৃণমূল ছাড়তেই বদলে গেল ভাগ্য: বিনা মূল্যে অর্ধেক জমি!
চলতি বছরের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের পরাজয়ের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন ইউসুফ-সহ দলের একাংশ সাংসদ। ১৪ জুন তাঁরা নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপিআই এ যোগ দিয়ে এনডিএ-কে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। সেপ্টেম্বরে ইউসুফ ওই দলের ভাইস প্রেসিডেন্টও নিযুক্ত হন।
আর ঠিক তার পরেই, গত অগাস্ট মাসে নাটকীয়ভাবে আদালতের মামলা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ইউসুফ। আইনি লড়াইয়ের পাট চুকতেই গুজরাত সরকার ইউসুফের অনুকূলে জমি হস্তান্তরের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়ে দেয়। গত ১৩ অগাস্ট প্রস্তুত হওয়া সরকারি প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০০০ বর্গ মিটার জমির মধ্য থেকে ৫০০ বর্গ মিটার জমি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (উপহার) দেওয়া হচ্ছে ইউসুফ পাঠানকে। বাকি ৪৭৮ বর্গ মিটার জমি তাঁকে কিনতে হবে, তবে বাজারমূল্যের ওপর বিশাল ৫৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
এই মুহূর্তে বদোদরা পুরসভার স্ট্যান্ডিং কমিটির তৈরি করা হিসাব অনুযায়ী, ওই এলাকার বর্তমান বাজারদর প্রতি বর্গ মিটারে ২ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ১০০০ বর্গ মিটার জমির মোট বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২০.৫ কোটি টাকা। অন্যদিকে, ১৪ বছরের জবরদখলের জন্য ইউসুফের ৭.৫ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও, নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে সেই সমস্ত আইনি খাঁড়াও উধাও হয়ে গেছে। অর্ধেক জমি বিনামূল্যে এবং বাকি অর্ধেক জলের দরে পাওয়ায় সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভিভিআইপি তোষণের এই ছবি নিয়ে এখন তোলপাড় শুরু হয়েছে।
বদোদরা পুরসভার কমিশনার অরুণ মহেশবাবু সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, রাজ্য সরকারের অনুমোদনপত্র এসে পৌঁছেছে এবং খুব শীঘ্রই শর্তাবলী খতিয়ে দেখে তা স্ট্যান্ডিং কমিটি ও বোর্ডের কাছে পাঠানো হবে। তবে বিরোধী রাজনৈতিক মহল ও সমাজকর্মীদের প্রশ্ন, একজন সাধারণ নাগরিক জবরদখল করলে যেখানে বুলডোজার ও কঠোর আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়, সেখানে শাসক শিবিরের হাত ধরতে না ধরতেই কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি এভাবে ‘উপহার’ হিসেবে কীভাবে বিলিয়ে দেওয়া যায়? রাজনৈতিক আনুগত্য বদলানোর পুরস্কার হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হরিলুটের এই সংস্কৃতি দেশের আইনের শাসনকেই বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউসুফ পাঠানের এই ‘অচ্ছে দিন’ শেষ পর্যন্ত আইনি বা রাজনৈতিক কোনো নতুন মোড় নেয় কিনা, এখন সেদিকেই তাকিয়ে দেশবাসী।





