জামিন মিললেও কাটেনি আইনি মেঘ; সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি পুলিশের, আসাম জুড়ে ফের তুঙ্গে জুবিন-ন্যায়বিচারের দাবি
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ১৯ অক্টোবরঃ কারাগারের লোহার ফটকটি যখন ধীরে ধীরে খুলে গেল, বাইরে তখন কড়া রোদ। দীর্ঘদিনের বন্দী জীবনের ছাপ শরীরে স্পষ্ট, চেহারায় অযত্নে বেড়ে ওঠা লম্বা দাড়ি, পিঠ ছুঁইছুঁই অবিন্যস্ত চুল। হাতজোড় করে কিংবা মাথা নিচু করে নীরবেই বাক্সা জেলার ‘নিকাশি’ কারাগারের চত্বর ছেড়ে মুক্ত আকাশের নীচে বেরিয়ে এলেন অসম পুলিশের সাসপেন্ডেড ডিএসপি সন্দীপন গার্গ। বছরব্যাপী বন্দিদশার পর অবশেষে গৌহাটি হাইকোর্টের জামিন মঞ্জুরের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় তিনি কারামুক্ত হলেন। কিন্তু তিনি কি সত্যিই ‘মুক্ত’? নাকি এক আইনি ও সামাজিক কাঠগড়া থেকে বেরিয়ে প্রবেশ করলেন অন্য এক দীর্ঘতর লড়াইয়ের ময়দানে?
সংগীতশিল্পী জুবিন গার্গের রহস্যজনক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর পর পুরো অসম জুড়ে যে আবেগের ঝড় উঠেছিল, সন্দীপনের এই জেলমুক্তি তাতে এক নতুন আগ্নেয়গিরির সৃষ্টি করেছে। জুবিনের অগুনতি অনুরাগী এবং আসামের সুশীল সমাজ এই মুক্তিকে দেখছেন বিষাদের চোখে, অন্যদিকে আইনি পরিভাষায় সন্দীপন গার্গ পেয়েছেন সাময়িক স্বস্তি।
২০২৫ সালের অক্টোবরের সেই অভিশপ্ত দিনের কথা আসামবাসী আজও ভুলতে পারেনি। স্বনামধন্য ও জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী জুবিন গার্গের অকাল এবং রহস্যময় মৃত্যুর পরপরই উঠে আসে একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ গ্রেপ্তার করে জুবিনেরই নিকট আত্মীয় তথা পুলিশ কর্মকর্তা সন্দীপন গার্গকে। তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয় মারাত্মক অভিযোগ, অনিচ্ছাকৃত হত্যা (Culpable Homicide Not Amounting to Murder)।

বিগত প্রায় এক বছর ধরে বাক্সা জেলেই ঠাঁই হয়েছিল এই প্রভাবশালী পুলিশ আধিকারিকের। পদ স্থগিত হওয়ার পাশাপাশি খোয়া যায় সামাজিক সম্মানও। দীর্ঘ আইনি টানাপোড়েনের পর গত ১৬ অক্টোবর গৌহাটি হাইকোর্ট তাঁর জামিন আবেদন মঞ্জুর করে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র এবং জামিনের শর্তাবলী পূরণ হওয়ার পর সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি কারামুক্ত হন।
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করাচ্ছেন, “জামিন পাওয়া মানেই অপরাধমুক্ত হওয়া নয়।” এটি স্রেফ বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালীন বন্দিদশা থেকে সাময়িক অব্যাহতি। সন্দীপনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার এখনো আদালত কক্ষে পূর্ণ উদ্যমে চলবে। সন্দীপন গার্গের মুক্তির পরপরই রাজ্য রাজনীতির পাশাপাশি আসামের স্বরাষ্ট্র ও বিচারবিভাগীয় মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এক অলিখিত চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে অসম পুলিশের অভ্যন্তরেও। কারণ, নিজের সংস্থায় কাজ করা প্রাক্তন সহকর্মীর মুক্তির আদেশে মোটেও হাত গুটিয়ে বসে নেই পুলিশ প্রশাসন।
অসম পুলিশের শীর্ষ সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, সন্দীপন গার্গ এবং এই মামলার অপর অভিযুক্ত অমৃতপ্রভা মহন্তের জামিনের আদেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তাঁরা দেশের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে চলেছেন। রাজ্য পুলিশের এই কঠোর অবস্থান বার্তা দিচ্ছে, প্রভাবশালী কিংবা সহকর্মী হলেও কাউকে ছাড় দিতে নারাজ তদন্তকারী দল।
আইনজীবীদের একাংশের মতে, সুপ্রিম কোর্টে যদি রাজ্য পুলিশের আর্জি গৃহীত হয় এবং হাইকোর্টের জামিনের ওপর স্থগিতাদেশ আসে, তবে সন্দীপন গার্গকে হয়তো আবারও ফিরে যেতে হতে পারে কারাগারের চার দেয়ালের ভেতরে। জুবিন গার্গ কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন আসামের আবেগ, সংস্কৃতি ও প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর। ফলে তাঁর মৃত্যুর তদন্তে যেকোনো ধরণের শিথিলতা বা অভিযুক্তদের মুক্ত বাতাস সেবন করাকে সহজভাবে নিতে পারছেন না তাঁর লাখ লাখ ভক্ত।
আজ বাক্সা কারাগারের বাইরে সন্দীপন গার্গের দীর্ঘ চুল ও দাড়ি সম্বলিত চেহারা যখন গণমাধ্যমের ক্যামেরায় ধরা পড়ে, মুহূর্তের মধ্যে সেই ছবি ও খবর ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। নেটিজেনদের একাংশ ও জুবিন-প্রেমীরা সোচ্চার হয়েছেন ন্যায়বিচারের দাবিতে। তাঁদের মূল প্রশ্ন, একজন সাধারণ মানুষ যদি এই অপরাধের অভিযুক্ত হতো, তবে কি আইনি প্রক্রিয়ার এই গতি একই থাকত? একজন সাসপেন্ডেড উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক বলেই কি প্রমাণের ফাঁক গলে জামিনের পথ প্রশস্ত হলো?
এই ক্ষোভ ও সামাজিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে সরকার ও রাজ্য পুলিশ প্রশাসন কোনোভাবেই নিজেদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে দিতে চাইছে না। আর সে কারণেই সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত। সন্দীপন গার্গের জন্য বাইরের জগত হয়তো এখন মুক্ত, কিন্তু রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে তিনি এখন চরম কোণঠাসা। একদিকে মাথার ওপর ঝুলছে অনিচ্ছাকৃত হত্যার গুরুতর চার্জশিট, অন্যদিকে পুলিশের সুপ্রিম কোর্টমুখী পদক্ষেপ। একই সাথে সমাজের তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভের মুখোমুখি হওয়া।
জুবিন গার্গের মৃত্যু রহস্যের জট কি আদৌ কোনোদিন পুরোপুরি খুলবে? অভিযুক্তদের কি উপযুক্ত শাস্তি হবে, নাকি আইনি মারপ্যাঁচে সময় গড়ালেই ধামাচাপা পড়ে যাবে অসমের প্রিয় শিল্পীর মৃত্যুর বিচার? বাক্সা জেল থেকে সন্দীপন গার্গের এই যাত্রা কেবল একটি কারাগার থেকে বেরিয়ে আসা নয়, বরং এটি আসামের বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থার এক চরম পরীক্ষার সূচনা। আগামী দিনে শীর্ষ আদালতে এই মামলার মোড় কোন দিকে ঘোরে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে পুরো রাজ্য।





