গ্রেপ্তারির পর জামিনে বেরিয়ে সামাজিক বিচারসভার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ; ২৫ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই উধাও প্রতারক।
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ বরাক উপত্যকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র শিলচরে সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এক অবিশ্বাস্য ও লোমহর্ষক আর্থিক কেলেঙ্কারির মুখোশ খুলে গেছে। লোভের ফাঁদ পেতে এবং ব্যবসার নাম ভাঙিয়ে সাধারণ খেটে খাওয়া ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছ থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত সাদ্দাম হোসেন মজুমদার এখন রাতের অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের চোখে ধুলো দিচ্ছে।
শিলচরের বেরেঙ্গা দ্বিতীয় খণ্ড এলাকার এই বাসিন্দা আইনি মারপ্যাঁচে জেল থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর থেকেই উধাও হয়ে যাওয়ায় চরম সর্বনাশের মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন শত শত পাওনাদার বিনিয়োগের নামে আকাশছোঁয়া লভ্যাংশ দেওয়ার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং প্রতারণার এক সুপরিকল্পিত ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়িত করে এই চক্রটি যেভাবে বরাকের অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছে, তা কেবল একটি সাধারণ আর্থিক জালিয়াতি নয়, বরং এটি অসহায় মানুষের পেটে লাথি মারার এক নির্মম দলিল।

গোপন সূত্রে ও ভুক্তভোগীদের বিবরণে উঠে এসেছে এক ভয়ঙ্কর চিত্র। অভিযুক্ত সাদ্দাম হোসেন মজুমদার বেশ কিছুদিন ধরে শিলচরের বিভিন্ন এলাকায় একটি বিশাল ব্যবসা ফেঁদে বসার ধুয়া তুলে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করতে শুরু করে। তার চালচলন এবং মিষ্টি কথায় বিশ্বাস করে মানুষ যখন তার কাছে আসত, তখন সে এক সুচারু ছক কষে তাদের সামনে হাজির করত ‘অল্প দিনে অধিক মুনাফা’-র লোভনীয় অফার।
ব্যবসার বিভিন্ন লাভজনক খাতের নাম করে সে ছোট ব্যবসায়ী, সরকারি চাকুরিজুড়ে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, এমনকি দিনমজুর শ্রেণির মানুষের কাছ থেকেও তিল তিল করে অর্থ সংগ্রহ করতে থাকে। অপরাধের কৌশল হিসেবে সাদ্দাম শুরুতে কিছু মানুষকে সামান্য কিছু প্রফিট রিটার্ন বা লভ্যাংশ হাতে দিত। আর এই ছোট্ট চাতুরীটিই তার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। মানুষ যখন দেখত যে টাকা দিলেই নির্দিষ্ট সময়ে লাভ মিলছে, তখন তারা অন্ধের মতো বিশ্বাস করতে শুরু করে। এই অন্ধ আস্থার সুযোগ নিয়েই সাদ্দাম তার নেটওয়ার্ক বহুগুণ প্রসারিত করে।
একে একে বহু মানুষ তাদের জীবনের সারা জীবনের সঞ্চিত সম্বল, ব্যাংক লোন কিংবা সুদে নেওয়া টাকা সাদ্দামের হাতে তুলে দেন। এভাবেই তিলে তিলে গড়ে ওঠে প্রায় ৫ কোটি টাকার এক বিশাল কালো পাহাড়। কিন্তু যখনই আসল সময় আসে, অর্থাৎ বিনিয়োগের মেয়াদ শেষ হয়ে মূলধন ও লভ্যাংশ ফেরত দেওয়ার পালা শুরু হয়, তখনই এক একটি করে ফানুস ফুটতে শুরু করে এবং লাপাত্তা হতে শুরু করে সাদ্দামের সমস্ত প্রতিশ্রুতি।
টাকা ফেরত পেতে মাসের পর মাস সাদ্দামের দরজায় কড়া নেড়ে, হাতজোড় করে অনুরোধ করেও যখন কানাকড়িও উদ্ধার হয়নি, তখন ধৈর্য হারান ভুক্তভোগীরা। নিরুপায় ও সর্বস্বান্ত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা সম্মিলিতভাবে শিলচর পুলিশের দ্বারস্থ হন এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেন।
পুলিশের তৎপরতায় গত এপ্রিল মাসে অভিযুক্ত সাদ্দাম হোসেন মজুমদারকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। সেই সময় এই গ্রেপ্তারের খবরে ভুক্তভোগীদের মনে সামান্য হলেও আশার আলো জিতেছিল যে, অন্তত আইনের কড়া খাঁড়ায় তাদের কষ্টার্জিত অর্থ উদ্ধার হওয়ার একটি রাস্তা খোলা হলো।
কিন্তু আইনের মারপ্যাঁচে এবং ফাঁকফোকর গলিয়ে সম্প্রতি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে সাদ্দাম। কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সে অনুতপ্ত হওয়ার পরিবর্তে এক নতুন নাটকের জন্ম দেয়। আইন বা আদালতের তোয়াক্কা না করে সে এলাকার কিছু প্রভাবশালী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি তথাকথিত ‘সামাজিক বিচারসভা’-র শরণাপন্ন হয়।
সেই বিচারসভায় দাঁড়িয়ে সে বুক বাজিয়ে, পবিত্র কসম কেটে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, আগামী ২৫ দিনের মধ্যে সে সমস্ত পাওনাদারের একটি কানাকড়িও সুদসহ পুরোপুরি ফেরত দিয়ে দেবে। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সামনে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি যে নিছকই একটি আইওয়াশ, প্রতারণার পরবর্তী ধাপ এবং সময়ক্ষেপণের এক সুচিন্তিত চাল ছিল, তা বুঝতে ভুক্তভোগীদের খুব বেশি দিন সময় লাগেনি।
সামাজিক বিচারসভার সেই প্রতিশ্রুতির কথা মাথায় রেখে পাওনাদাররা যখন এক বুক আশা নিয়ে দিন গুনছিলেন, তখনই ঘটে আসল বিপর্যয়। ২৫ দিন তো দূরের কথা, প্রতিশ্রুতির নির্ধারিত ২০ দিন পূর্ণ হওয়ার আগেই রাতের অন্ধকারে লেজ গুটিয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় সাদ্দাম হোসেন মজুমদার। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো বর্তমানে সুইচড অফ এবং তার বসতবাড়ি থেকে শুরু করে ব্যবসার সমস্ত ঠিকানায় ঝুলছে ঝোলা তালা।
এই আকস্মিক পলায়নে মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর। কারো মেয়ের বিয়ের জমানো টাকা ছিল সেই তহবিলে, কারো সারাজীবনের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা, আবার কেউ নিজের একমাত্র মাথা গোঁজার ঠাঁই বিক্রি করে সাদ্দামের হাতে তুলে দিয়েছিলেন লাভের আশায়। এখন এই বিপুল পরিমাণ অর্থ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা। অনেকের ঘরে আজ দুবেলা দুমুঠো খাবার জোটার অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জামিনে বেরিয়ে একজন অভিযুক্ত কীভাবে এভাবে প্রকাশ্যে আদালতের শর্ত, সামাজিক প্রতিশ্রুতি এবং মানবতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গা ঢাকা দিতে পারে, তা নিয়ে এখন তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে সচেতন মহলে। প্রতারক সাদ্দামের এই ধূর্ত বুদ্ধির কাছে নুইয়ে পড়া মানুষগুলো এখন প্রশাসনের প্রতি পূর্ণাঙ্গ আস্থার জায়গায় দাঁড়িয়ে মরিয়া হয়ে দ্রুত ও কঠোর পুলিশি হস্তক্ষেপের দাবি তুলেছেন।
ভুক্তভোগী ও অভিযোগকারীদের একটাই প্রাণের দাবি, যেভাবেই হোক সাদ্দাম হোসেন মজুমদারকে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে খুঁজে বের করে তার কাছ থেকে লুণ্ঠিত প্রায় ৫ কোটি টাকা উদ্ধার করতে হবে এবং তাকে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোরতম শাস্তির মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে।
বরাক উপত্যকার বুকে এই ধরনের প্রতারক চক্রগুলোর শিকড় কত গভীরে প্রোথিত রয়েছে, শিলচরের এই ঘটনা তারই এক চোখ খোলার মতো অন্ধকার দলিল। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই পলাতক প্রতারককে পাকড়াও করে ভুক্তভোগী মানুষগুলোর চোখের জল মুছিয়ে দিতে কতখানি দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে, এখন সমগ্র অঞ্চলের নজর সেই দিকেই।





