পুলিশি হস্তক্ষেপে রাস্তা ফাঁকা হলেও দুই রাজ্য সরকারের স্পষ্ট নিরাপত্তার আশ্বাসের দাবিতে অনড় আন্দোলনকারীরা
বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২ সেপ্টেম্বরঃ ভারী বুটের তলায় চাপা পড়া শান্তি আর সীমান্তে বুলডোজারের আওয়াজের ক্ষত এখনও পুরোপুরি শুকোয়নি। তার মধ্যেই ফের অশান্তির কালো মেঘ ঘনিয়ে উঠল বরাক উপত্যকার প্রবেশদ্বার অসম-মিজোরাম সীমান্তের লাইলাপুরে। মিজোরামে পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন, লাগাতার ভয় দেখানো এবং বেপরোয়া অর্থ আদায়ের প্রতিবাদে এবং সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তার দাবিতে গত তিন দিন ধরে ফুঁসছে লাইলাপুর।
মঙ্গলবার এই আন্দোলন চরম রূপ ধারণ করে, যখন বিক্ষুব্ধ ট্রাকচালকরা পুলিশের বারণকে তোয়াক্কা না করে সড়ক অবরোধ চালিয়ে যান। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত পুলিশি হস্তক্ষেপে রণক্ষেত্র পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা বরাক উপত্যকার আন্তঃরাজ্য বাণিজ্যের ভঙ্গুর নিরাপত্তাকে ফের এক বিরাট প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
বরাক উপত্যকা এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য রাজ্যগুলির সঙ্গে বাণিজ্যের প্রধান লাইফলাইন হলো এই অসম-মিজোরাম সীমান্ত করিডর। কিন্তু বিগত বেশ কিছুদিন ধরে অভিযোগ উঠছে যে, অসমের সীমান্ত পার হয়ে যখনই পণ্যবাহী ট্রাকগুলি মিজোরামের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে, তখনই একশ্রেণির দুষ্কৃতী ও স্থানীয়দের হাতে চরম হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে চালকদের। কখনও রাতের অন্ধকারে অস্ত্রের মুখে গাড়ি থামিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা বা অবৈধ অর্থ দাবি, কখনও আবার প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি নিত্যদিনের এই অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন চালক সমাজ।
চালক ও খলাসিদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণে রূপ নেয়। নিরাপত্তার দাবিতে লাইলাপুরে গড়ে ওঠা ‘স্টিং ছাড়ো’ আন্দোলন শুধু একটি প্রতীকী প্রতিবাদে আটকে থাকেনি, বরং তা পরিণত হয়েছে চালকদের জীবন-মরণের লড়াইয়ে। যতদিন না অসম ও মিজোরাম সরকার যৌথভাবে ট্রাকচালকদের জীবন ও সম্পত্তির পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে লিখিত ও স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, ততদিন এই সীমান্ত ছাড়বেন না বলে পণ করেছিলেন আন্দোলনকারীরা।
গত তিন দিন ধরে চলা এই অবরোধের জেরে মঙ্গলবার সকালে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পুলিশি অনুরোধ ও আশ্বাসেও যখন আন্দোলনকারী চালকরা রাস্তা থেকে সরতে রাজি হননি, তখন বাধ্য হয়েই প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কাছাড় জেলার উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং বিক্ষোভকারীদের হঠিয়ে দিয়ে জোরপূর্বক যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। মহাসড়কের মাঝখান থেকে অবরোধ হটিয়ে দেওয়া হলেও ক্ষোভে ফুঁসতে থাকা চালকরা দমে যাননি।
তারা মহাসড়কের একেবারে পাশেই ট্রাক পার্কিং করে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, পুলিশের লাঠি বা প্রশাসনের চোখরাঙানি দিয়ে চালকদের মুখ বন্ধ করা যাবে না। যতক্ষণ না দুই রাজ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে, ততক্ষণ একটিও বাণিজ্যিক পণ্যবাহী ট্রাককে লাইলাপুর চেকপোস্ট পার হয়ে মিজোরামে ঢুকতে দেওয়া হবে না।
এই টানা অবরোধ ও উত্তেজনার ফলে আন্তঃরাজ্য করিডরের দু’পাশে সারি দিয়ে আটকে পড়েছে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক। ফলস্বরূপ, অসম থেকে মিজোরামে খাদ্যসামগ্রী, জ্বালানি এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্য সরবরাহে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটেছে। এর ফলে আগামী দিনে উভয় রাজ্যেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজারে চরম সংকটের কালো ছায়া নেমে আসার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাণিজ্যিক যান চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক ও অব্যাহত রাখার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে দফায় দফায় আন্দোলনকারী চালক ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা চালানো হলেও শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধানসূত্র বা কমপ্রোমাইজ ফর্মুলা বের হয়নি। প্রশাসন কেবল বলপ্রয়োগ করে বা সাময়িক আশ্বাস দিয়ে রাস্তা ফাঁকা করার চেষ্টা চালালেও, চালকদের মনে জেঁকে বসা ভীতি ও নিরাপত্তার অভাব দূর করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
দুই প্রতিবেশী রাজ্যের সীমানায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতি এবং চালকদের ওপর চলা লাগাতার দমনপীড়নের ঘটনা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের অভাবে বরাক উপত্যকার অর্থনীতির মেরুদণ্ড আজ কতটা নড়বড়ে।
প্রশাসনিক ফাইলচাপা দিয়ে বা পুলিশি জবরদস্তি চালিয়ে এই বারুদের স্তূপকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে ঠেকানো যাবে না। অবিলম্বে দুই রাজ্য সরকারকে আলোচনার টেবিলে বসে ট্রাকচালকদের সুরক্ষায় কঠোর ও বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ করতে হবে, নতুবা লাইলাপুরের এই স্ফুলিঙ্গ যে কোনো মুহূর্তে সমগ্র উপত্যকায় দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।






