মোদি সরকারের শিক্ষা নীতিতে বিস্ফোরক প্রশ্ন মুরলী মনোহর জোশীর, সরকার নিজেরাই কেলেঙ্কারি করছে

হিন্দি দৈনিক ‘অমর উজালা’-র পরামর্শদাতা সম্পাদক বিনোদ অগ্নিহোত্রীকে দেওয়া এক দীর্ঘ ও কঠোর সাক্ষাৎকারে বর্ষীয়ান এই শীর্ষ নেতা বর্তমান শাসনব্যবস্থার নীতিগত দিকনির্দেশনা নিয়ে যেসব প্রশ্ন তুলেছেন, তা রাজনৈতিক মহলে এক প্রচণ্ড ঝড়ের সৃষ্টি করেছে। ২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাগ্রহণের পর বিজেপির এই জ্যেষ্ঠ নেতাকে দলীয় মার্গদর্শক মণ্ডলে পাঠিয়ে কার্যত কোণঠাসা ও নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। দীর্ঘদিন নীরব থাকার পর তাঁর এই নীতিগত আক্রমণ কেবল কেন্দ্র সরকারকেই নয়, পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর কঙ্কালসার অবস্থাকে উন্মোচিত করেছে।

শিক্ষাঙ্গনে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে শুধুমাত্র একটি পরীক্ষা ব্যবস্থার যান্ত্রিক ত্রুটি বা কিছু অসৎ মানুষের কারসাজি হিসেবে দেখতে নারাজ ড. জোশী। তিনি বিষয়টিকে অত্যন্ত গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করে বলেছেন, সমাজের প্রতিটি স্তরে তৈরি হওয়া দুর্নীতির বিষবাম্পই আজকের তরুণ প্রজন্মকে এই পথে ঠেলে দিচ্ছে। নিজের আমলের শাসনব্যবস্থার সঙ্গে বর্তমান কাঠামোর তুলনা টেনে জোশী অত্যন্ত শক্ত ভাষায় প্রশ্ন করেন, আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইছি, অটল বিহারী বাজপেয়ীর সরকারের আমলে কেন কোনোদিন প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি?

কারণ তখন মূল কাঠামোর প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হতো। আজ আপনি চতুর্দিকে কী দেখছেন? ব্যাংকে কেলেঙ্কারি হচ্ছে, ব্যবসায় দুর্নীতি হচ্ছে, এমনকি সরকার নিজেরাই তো কেলেঙ্কারি করছে! যখন শিশুটি দেখে তার শিক্ষক ঘুষ দিয়ে চাকরি পেয়েছেন, মন্ত্রী ও বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে, তখন সে শেখে যে ধনী হওয়ার সহজ পথ এটাই। আমরাই এই দুর্নীতির পথ তৈরি করেছি, আর এখন বাচ্চাদের ওপর দায় চাপিয়ে বলছি এমন হচ্ছে কেন?

প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সরকারের চরম কেন্দ্রীকরণ ও অতি-নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপকেও তীব্র রসিকতায় বিদ্ধ করেছেন জোশী। যন্তর মন্তরে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ও কেন্দ্রের সেনা-বিমান ব্যবহারের তোড়জোড় প্রসঙ্গে তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ভাই, দৃশ্যটা অসাধারণ! এখন প্রশ্নপত্র নাকি ছাপাখানা থেকে সেনার পাহারায় বিমানে করে নিয়ে যাওয়া হবে! পরীক্ষা হচ্ছে না, যেন দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে!

এই পুরো ব্যবস্থাই এক হাস্যাস্পদ জায়গায় পৌঁছেছে। মোদি সরকারের বহুল প্রচারিত ‘বিকশিত ভারত’ এবং নীতি আয়োগের অর্থনৈতিক মডেলকে একহাতে নিয়েছেন সাবেক এই মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট জানান, মোদি সরকারের অগ্রাধিকারের তালিকায় ‘শিক্ষা’ বা ‘স্বাস্থ্য’ কখনোই ছিল না।

ড. জোশীর মতে, প্রকৃত উন্নয়নের ভিত্তি হওয়া উচিত মানবসম্পদ বিকাশ। অথচ বর্তমান বাজেটের রূপরেখা দেখলে বোঝা যায়, প্রাথমিক শিক্ষা ও চিকিৎসায় সরকারি খরচ ক্রমাগত ছাঁটাই করা হচ্ছে এবং কেবল রাস্তা ও অবকাঠামো নির্মাণে অঢেল টাকা ঢালা হচ্ছে।

জোশীর তীক্ষ্ণ প্রশ্ন, আপনি বড় বড় রাস্তা বানিয়ে ফেলছেন, কিন্তু সেই রাস্তা বানানোর দেশীয় প্রযুক্তি কোথায়? যে ইঞ্জিনিয়ার বা বিশেষজ্ঞরা এগুলো সামলাবেন, তাঁরা তৈরি হবেন কোথা থেকে? তার জন্য তো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দরকার। আপনি যদি বিদেশ থেকে যন্ত্র আর লোক নিয়ে এসে রাস্তা বানান, তবে সেই উন্নয়নের লাভটা কার হলো?

তিনি আরও যোগ করেন, আদিবাসী বা প্রান্তিক সমাজকে তথাকথিত অর্থনৈতিক মানদণ্ডে ‘অনুন্নত’ বলা হলেও তারা প্রকৃতি রক্ষা করে, চুরি বা মিথ্যা না বলে শান্তিতে বসবাস করে। কিন্তু বর্তমান সরকার জীবনমূল্য ও নীতিকে বাদ দিয়ে কেবল ‘অর্থনৈতিক লাভ ও পুঁজিপতিদের উন্নয়নকেই’ আসল উন্নয়ন বলে ভুল ব্যাখ্যা করছে।

শিক্ষায় লাগামহীন বেসরকারিকরণ এবং উচ্চশিক্ষার চরম আকাশছোঁয়া ব্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ড. জোশী। তিনি সরকারকে কটাক্ষ করে বলেন, একদিকে মুখে ‘মহৎ বৈদিক ঐতিহ্য’ এবং ‘জ্ঞান-পরম্পরা’র ফাঁকা বুলি দেওয়া হচ্ছে, আর অন্যদিকে বাস্তবে এমন এক শিক্ষা পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে যেখানে সাধারণ মধ্যবিত্ত বা গরিবের প্রবেশাধিকারই নেই।

আজকে ভালো শিক্ষা পেতে হলে শিক্ষার্থীকে বলা হচ্ছে ৫০ লাখ টাকা নিয়ে আসো! একজন গরিবের সন্তান এই ৫০ লাখ টাকা কোথায় পাবে? এর ফলে সমাজে যে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, তার ভয়াবহ সামাজিক প্রভাব পড়ছে আইআইটি বা দিল্লির মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোতে। কেন শুধু দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানেই ছাত্রছাত্রীরা আত্মহত্যা করছে?

ছোট স্কুলে কেন হচ্ছে না? কারণ এই বৈষম্য এবং টাকার চাপ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি অভিন্ন স্কুলব্যবস্থার জোর সমর্থক হিসেবে সওয়াল করেন, দেশের প্রতিটি শিশুর জন্য সে প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হোক বা দিনমজুরের সন্তান মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে একই পাড়া-মহল্লার স্কুলে পড়ার সংবিধানগত আইন থাকা জরুরি।

মোদি সরকারের বহুল প্রশংসিত জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ (এনইপি)-র আসল স্বরূপ উন্মোচন করতে গিয়ে জোশী এক চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। তিনি জানান, অটল বিহারী বাজপেয়ীর আমলেই যখন পাঠ্যপুস্তক নিয়ে বিতর্কের জেরে তাঁকে শিক্ষানীতি পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি ডিক্রি জারি করে বলেছিলেন রাজীব গান্ধীর আমলের শিক্ষানীতি পাল্টানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ কেবল সরকার পরিবর্তনের জন্য নীতি বদলানো কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়; পুরনো নীতিতেই প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকীকরণ সম্ভব ছিল।

বর্তমান শিক্ষানীতি তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর বন্ধু তথা শিক্ষানীতি কমিটির চেয়ারম্যান বিজ্ঞানী কে. কস্তুরীরঙ্গনের সঙ্গে হওয়া কথোপকথন তুলে ধরে জোশী বলেন, আমি কস্তুরীরঙ্গনকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলাম নতুন শিক্ষানীতিতে তোমরা ঠিক কী করছ? কস্তুরীরঙ্গন আমাকে উত্তর দিয়েছিলেন, কমিটি যা করার করছে।

আমার কাছে নানা জায়গা থেকে যা কিছু লিখে পাঠানো হয়, আমি শুধু সেগুলোকে এক জায়গায় সমন্বিত করে দিই। নীতি আয়োগ থেকে অনেক এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের সময়েও পরিকল্পনা কমিশন ছিল, কিন্তু তারা শিক্ষাদপ্তরের স্বাধীনতা ও নীতিনির্ধারণে কখনোই এভাবে হস্তক্ষেপ করত না।

শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার অজুহাতে দেশের হাজার হাজার সরকারি স্কুল বন্ধ করে দেওয়ার যে নীতি মোদি সরকার নিয়েছে, তাকে কঠোর ভাষায় ধিক্কার জানিয়েছেন এই জ্যেষ্ঠ বিজেপি নেতা। সরকারি স্কুলের করুণ অবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি এক ছাত্রীর সাম্প্রতিক প্রতিবাদের উদাহরণ দেন, যেখানে বলা হয়েছিল স্কুলে কোনো পদার্থবিদ্যার শিক্ষক নেই, অন্য স্কুলে ছাদ নেই এবং ভবনের ভগ্নদশা।

জোশী তোপ দেগে বলেন, স্কুলে শিক্ষক নেই, মৌলিক অবকাঠামো নেই, ছাদ ভেঙে পড়ছে, আর আপনারা বলছেন ছাত্রসংখ্যা কমছে তাই স্কুল বন্ধ করে দেব! শিক্ষক কেন আসবেন? আপনারা তো কোনো ব্যবস্থাই করেননি! আপনি স্কুল খুলে দিয়েছেন, অথচ শিক্ষক রাখেননি, তবে ছাত্ররা স্কুলে গিয়ে কী করবে? সমস্যা সমাধানের ইচ্ছা থাকলে আজই পরিকাঠামো ঠিক করে দেখানো সম্ভব, কিন্তু সরকারের সেই সদিচ্ছাই নেই।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ড. মুরলী মনোহর জোশীর এই দীর্ঘ ও বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার কেবল শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি তুলে ধরে না, বরং এটি মোদি সরকারের সার্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শনের ওপর এক চূড়ান্ত নৈতিক চপেটাঘাত। দলীয় শৃঙ্খলা বা রাজনৈতিক সমীকরণের তোয়াক্কা না করে বিজেপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের এই সরাসরি আক্রমণ বিজেপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নীতিগত বিভাজনকে রাজপথে এনে ফেলেছে। দেশের কোটি কোটি বেকার যুবক, চাকরিপ্রার্থী এবং দিশেহারা শিক্ষার্থীদের পক্ষে জোশীর তোলা এই প্রশ্নগুলো আগামী দিনে সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর যে বড়সড় ধাক্কা দিতে চলেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

Related Posts

হিমালয়ে গলছে বরফ, মহা-জলপ্রলয়ের দ্বারপ্রান্তে ভারত-নেপাল-ভুটান, হিমালয়ের বুকে টিকটিক করছে ২২১টি টাইম বোমা, প্রলয়ংকারী জলপ্রলয়ের আশঙ্কায় কাঁপছে দক্ষিণ এশিয়া

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৯ আগষ্টঃ হিমালয়ের শুভ্র তুষারাবৃত পাহাড়ের নীরবতার নিচে ধীরে ধীরে দানা বাঁধছে এক শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও অব্যাহত জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় দ্রুত গলে…

আগে এনআরসি, তারপর লোকগণনা মণিপুরে উত্তপ্ত রাজপথ, ইম্ফলে মশাল মিছিলে গর্জে উঠলেন মহিলারা

বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৯ আগষ্টঃ সহিংসতার ক্ষত এখনও শুকায়নি, বহু পরিবারের স্বজন হারানোর কান্না এখনও থামেনি। পাহাড়ে সমতলে জাতিগত সংঘাতের রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠছে মণিপুরের…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *