বরাকবাণী ডিজিটাল ডেস্ক ২৯ আগষ্টঃ অশান্ত মণিপুরের মাটি ফের ভিজে গেল নিরীহ মানুষের রক্তে। দীর্ঘমেয়াদি কুকি-মেইতেই সংঘাতের জেরে এমনিতেই বারুদস্তূপে পরিণত হয়েছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই রাজ্যটি। এর মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার কাংপকপি জেলায় ঘটা এক নারকীয় তাণ্ডব রাজ্যজুড়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগ ও ভীতির সৃষ্টি করেছে। একদিনের ব্যবধানে একই জেলায় নাগা সম্প্রদায়ের পাঁচজন মানুষকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের একজন প্রধান শিক্ষকও রয়েছেন, যা এই ঘটনার পাশবিকতাকে আরও প্রকট করে তুলেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বৃহস্পতিবারের সেই বিভীষিকাময় দুপুরে আচমকাই একদল সশস্ত্র দুষ্কৃতী কাংপকপির একটি শান্ত জনপদে হানা দেয়। কোনো রকম পূর্বাবাস বা প্ররোচনা ছাড়াই তারা নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। চোখের পলকে বুলেটবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন সাধারণ মানুষ।
ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান পাঁচজন ব্যক্তি। নিহতদের তালিকায় এক স্কুলশিক্ষকের উপস্থিতি এই হামলাকে আরও বেশি মর্মান্তিক করে তুলেছে, যিনি প্রতিদিনের মতো সেদিনও নিজের দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই বর্বরোচিত হামলায় সমগ্র এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ঘটনার পর থেকেই স্থানীয় স্তরে কুকি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন গোষ্ঠীর দিকে অভিযোগের আঙুল উঠতে শুরু করেছে। যদিও মণিপুর পুলিশের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত অভিযুক্ত দুষ্কৃতীদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় বা তাদের কোন সংগঠনের সঙ্গে যোগ রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে এই ঘটনার জেরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যকার আস্থার সংকট আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে।
এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরানোর এই জঘন্য সংস্কৃতি কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ঘটনার পরপরই বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকারের তরফ থেকে এক জরুরি বিবৃতি জারি করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিংয়ের নেতৃত্বে রাজ্য মন্ত্রিসভার সদস্য, শীর্ষস্থানীয় আমলা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নিয়ে একটি জরুরি উচ্চপর্যায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
ওই বৈঠকে কড়া বার্তা দিয়ে জানানো হয়েছে, শান্তি আলোচনা প্রক্রিয়ায় যুক্ত যে সমস্ত বিদ্রোহী সংগঠন ‘সাসপেনশন অব অপারেশনস’ চুক্তির আওতায় রয়েছে, তাদের কোনো সদস্য যদি নির্ধারিত ক্যাম্প বা শিবিরের বাইরে অস্ত্র হাতে ঘোরাফেরা করে, তবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের এই কঠোর অবস্থানের পরও উপত্যকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যে বিরাট এক চ্যালেঞ্জ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সাল থেকে চলা কুকি-মেইতেই জাতিগত সংঘাতে মণিপুর ইতিমধ্যেই এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের সাক্ষী। এই দীর্ঘমেয়াদি হিংসার জেরে রাজ্যে ইতিমধ্যেই কয়েকশো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। ঘরছাড়া হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। শুধু সাধারণ নাগরিকরাই নন, বারবার আক্রান্ত হয়েছেন খোদ নিরাপত্তারক্ষীরাও। গত মাসেই বিদ্রোহীদের অতর্কিত হামলায় অসম রাইফেলসের দুই জওয়ান শহিদ হয়েছিলেন। এছাড়া সম্প্রতি দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে এক সিআরপিএফ জওয়ানের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও রাজ্যবাসীর মনে আতঙ্ক বাড়িয়েছিল।
হিংসার এই ধারাবাহিকতায় দুষ্কৃতীদের বিরুদ্ধে একের পর এক সাধারণ মানুষের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। গত রবিবার রাত থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে চলা ধারাবাহিক হিংসাত্মক ঘটনায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেনাপতি এবং কাংপকপির মতো জেলাগুলি এই সংঘাতের জেরে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
নাগা সম্প্রদায়ের পাঁচজন মানুষকে এভাবে দিনের আলোয় গুলি করে হত্যার ঘটনায় প্রমাণিত হলো যে, এত কিছুর পরেও রাজ্যের গভীরে লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসবাদী ও দুষ্কৃতী নেটওয়ার্ক কতটা সক্রিয়। একদিকে রাজ্য সরকার ও বিভিন্ন নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলি যখন উপত্যকায় শান্তি ফেরানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এই ধরনের রক্তক্ষয়ী ঘটনা সেই শান্তি প্রক্রিয়াকে বারবার ভেস্তে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি আলোচনার বাতাবরণকে থমকে দিতেই এই সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এদিকে, বারবার চুক্তিভঙ্গ এবং হিংসাত্মক কার্যকলাপে লিপ্ত থাকার অভিযোগে ‘সাসপেনশন অব অপারেশনস’ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী প্রায় দুই ডজন বিদ্রোহী সংগঠনের ভূমিকা নিয়েও জনমনে এখন তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কাংপকপির এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর মণিপুরের সাধারণ মানুষ এখন কেবল একটাই প্রশ্ন করছেন, কবে কাটবে এই জাতিগত বৈরিতার ঘোর অমাবস্যা? কবে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরবে মণিপ্রভা? আপাতত গোটা উপত্যকা জুড়েই থমথমে ও চরম উদ্বেগের পরিস্থিতি বিরাজ করছে।



